জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাবে শুক্রবার এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদের হার নির্ধারণে এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘ সময় সুদের হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে—এমন আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোর সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড দ্রুত বেড়ে যায়।
শুক্রবার বন্ড ইয়েল্ড কিছুটা কমলেও বাজারের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুই বেঞ্চমার্কের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংকট নিরসনে এখনো কার্যকর সমঝোতা না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর খবরে উদ্বেগ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সেনাসদস্য পাঠাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজের বহর আগামী মাসে ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
এ ধরনের খবরের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আবারও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারে নতুন করে তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
সুদের হার নিয়ে নতুন হিসাব
জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বন্ডবাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদার মতে, বাজার এখন ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার আরও কয়েক দফা বাড়ার সম্ভাবনা হিসাবের মধ্যে রাখছে।
বছরের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন বাজারে একই সময়ের মধ্যে সুদের হার কমার প্রত্যাশা ছিল। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে সেই প্রত্যাশায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
রাজাকজাদা আরও উল্লেখ করেন, গত এক বছরে ব্লুমবার্গ কমোডিটি ইনডেক্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার মতে, পণ্যের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এশিয়ার বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে আগের দিনের ইতিবাচক লেনদেন সত্ত্বেও শুক্রবার এশিয়ার বেশির ভাগ শেয়ারবাজারে চাপ দেখা গেছে।
হংকংয়ের বাজারে ২ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। টোকিও, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, ম্যানিলা ও জাকার্তার বাজারও নিম্নমুখী ছিল। ছুটির কারণে সাংহাইয়ের বাজার বন্ধ ছিল।
তবে এর বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। দেশটির বড় চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সিডনি ও তাইপের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে নজর
বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে শুক্রবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোলস বা কৃষি খাতের বাইরের কর্মসংস্থান তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সুদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ধারণা পেতে বিনিয়োগকারীরা এ প্রতিবেদনের দিকে বিশেষ নজর রাখছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রত্যাশার তুলনায় কম আসায় পরবর্তী বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কিছুটা কমেছে। তবে কর্মসংস্থানের তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হলে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে নতুন করে যুক্তি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ফেডের কয়েকজন কর্মকর্তা ধীরে ও সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে সুদের হার কিছু সময় অপরিবর্তিত রাখার প্রত্যাশাও বাজারে রয়েছে।
ফেডের ভাইস চেয়ারম্যান ফিলিপ জেফারসন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক তথ্যের ধারাবাহিক প্রবণতা সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। গভর্নর মিশেল বোম্যানও এই মুহূর্তে দ্রুত নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখছেন না বলে জানিয়েছেন।
নিউইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামসও নীতিনির্ধারণে তাড়াহুড়ো না করে আরও তথ্য পর্যবেক্ষণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে ডালাস ফেডের প্রেসিডেন্ট লরি লোগান তুলনামূলক কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান—ফেডের দুই প্রধান লক্ষ্য বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদের হার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ফলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বন্ড ইয়েল্ডের ওঠানামা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানের নতুন তথ্য—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার এখন নীতিনির্ধারকদের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
















