‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’ আজ। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, নাগরিকদের সঠিক তথ্য সরকারি নথিতে সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণে নিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন একজন নাগরিকের আইনগত পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জন্মের পর একটি শিশুর সঠিক তথ্য নিবন্ধনের মাধ্যমে তার নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান এবং বাবা-মায়ের পরিচয়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য সরকারি নথিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়। একইভাবে কোনো নাগরিকের মৃত্যুর পর মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে তার মৃত্যুর তথ্য রাষ্ট্রীয় রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নাগরিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে জন্ম নিবন্ধন সনদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, পাসপোর্ট গ্রহণ, বিয়ে নিবন্ধন, চাকরি, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা নিতে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর জন্মের পর যথাসময়ে সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জন্ম নিবন্ধনের সময় তথ্যের সামান্য ভুলও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। জন্মতারিখ, নাম, জন্মস্থান কিংবা বাবা-মায়ের নামের সঙ্গে অসঙ্গতি থাকলে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদসহ অন্যান্য নথিতে তথ্যের মিল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নাগরিকদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন দাপ্তরিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
অন্যদিকে মৃত্যু নিবন্ধনেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও প্রশাসনিক ভূমিকা। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত না হলে সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, পারিবারিক অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সঠিক মৃত্যু নিবন্ধন মৃত ব্যক্তির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদের পাশাপাশি উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করতেও সহায়তা করে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রণয়নেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে। একটি দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা, জন্মহার, মৃত্যুহার ও জনসংখ্যার পরিবর্তন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকার এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করতে পারে।
বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নির্ভুল জন্ম ও মৃত্যু তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অঞ্চলে শিশুমৃত্যু, মৃত্যুহার কিংবা নির্দিষ্ট বয়সে মৃত্যুর প্রবণতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য থাকলে স্বাস্থ্য খাতের নীতি ও কর্মসূচি নির্ধারণ সহজ হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগের বিস্তার, মৃত্যুর কারণ এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বিশ্লেষণেও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এতে নিবন্ধন, তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের কাজ সহজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে তথ্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে নাগরিক সচেতনতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিবন্ধন কার্যক্রমের মান নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করলেই হবে না। জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে নিবন্ধন এবং মৃত্যুর পর যথাযথভাবে মৃত্যু নিবন্ধনের বিষয়ে সারাবছর নাগরিকদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় হয়রানি, অনিয়ম, ভুল তথ্য ও অযথা দীর্ঘসূত্রতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা, নাগরিক জীবনে এর ব্যবহার এবং সঠিক তথ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’—এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঙ্গে সুশাসনের সরাসরি সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভুল তথ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকলে সরকারি সেবা প্রদান, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যভিত্তিক ও কার্যকর করা সম্ভব।
নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করাই দিবসটির অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। যথাসময়ে সঠিক নিবন্ধন নিশ্চিত করা গেলে একদিকে নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে। তাই একটি স্বচ্ছ, নির্ভুল ও তথ্যনির্ভর নাগরিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
















