মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভবন ও সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) আঘাত হানা এ ভূমিকম্পে অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন। তবে সর্বশেষ পাওয়া খবরে কোনো প্রাণহানির তথ্য জানায়নি কর্তৃপক্ষ। শনিবার (১০ অক্টোবর) উদ্ধার তৎপরতা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অব্যাহত রয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রাজধানীতেও আতঙ্ক, রাস্তায় নেমে আসেন বাসিন্দারা
পানামার জাতীয় নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। প্রায় এক মিনিট ধরে চলা কম্পনে রাজধানী পানামা সিটির উঁচু ভবনগুলো থেকে আতঙ্কিত মানুষ দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল রাজধানী থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে ছিল। কম্পনের পর একাধিক পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় অনেক বাসিন্দা ভবনে ফিরে যেতে ভয় পান।
রাজধানীর ১৫ তলা একটি ভবনের বাসিন্দা ৪৬ বছর বয়সী সালোমন অ্যান্ডিয়ন জানান, প্রবল কম্পনে ঘরের ভারী আসবাব, বিছানা ও রান্নাঘরের জিনিসপত্র কাঁপতে থাকে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাঁকে দ্বিতীয়বারের মতো ভবন ছেড়ে বাইরে আশ্রয় নিতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি উঁচু ভবনের ছাদে থাকা সুইমিংপুলের পানি উপচে পড়তে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে পানামা খালের ওপর নির্মিত একটি সেতু প্রবলভাবে কাঁপতে দেখা গেলেও সেটি ভেঙে পড়েনি।
হেরেরা, কোকলে ও লস সান্তোসে বেশি ক্ষয়ক্ষতি
পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতিকে বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, কয়েকটি সড়ক সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফার্নান্দো বয়েডের তথ্য অনুযায়ী, হেরেরা, কোকলে ও লস সান্তোস প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লস সান্তোসের তোনোসি শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানে আকাশপথে পৌঁছানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
কোকলে প্রদেশের পেনোনোমে শহরে একটি গির্জা, হোটেল ও সরকারি ভবনে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ভারাগুয়াস প্রদেশের সোনা শহরে সাবেক প্রেসিডেন্ট রিকার্দো মার্তিনেল্লির বাড়িও ধসে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার, স্বাভাবিক পানামা খাল
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় শুক্রবার ১৭টা ৫৬ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল হেরেরা প্রদেশের পিতালোসা আরিবা এলাকার কাছাকাছি।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের মাত্রা ৮ দশমিক ০ নির্ধারণ করা হলেও পরে তা সংশোধন করে ৭ দশমিক ৭ করা হয়।
ভূমিকম্পের পর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাজধানীর টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। কয়েকটি ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।
৮০টির বেশি পরাঘাত, স্থগিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস
পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পের পর ৮০টির বেশি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে একটির মাত্রা ৬ দশমিক ০-এর বেশি ছিল। এসব পরাঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট মুলিনো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ভূমিকম্পের কারণে দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও গুয়াতেমালার নেতারা পানামার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজ, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরিদর্শন অব্যাহত রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















