পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি শাসন জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সমর্থকদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং প্রদেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রেসিডেন্টের দপ্তর।
রোববার (১১ অক্টোবর) পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি জরুরি ব্যবস্থা অনুমোদন করে সংশ্লিষ্ট আদেশে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে প্রদেশটির প্রশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাপক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইমরান খানের সমর্থকদের বিক্ষোভ
কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও মিছিল করছেন তার হাজারো সমর্থক। একই সঙ্গে দেশটির কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ আগে প্রদেশটির বিভিন্ন শহর ও জনপদে লং মার্চ কর্মসূচি শুরু করেন পিটিআই সমর্থকেরা। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, ইমরান খানকে তাঁর চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে হবে।
এদিকে প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রদেশটির বিভিন্ন শহরে সড়ক বন্ধ থাকার খবরও পাওয়া গেছে।
জরুরি শাসন নিয়ে পিটিআইয়ের আপত্তি
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দপ্তর জানিয়েছে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে পিটিআই। দলটির চেয়ারম্যান গোহর আলী খান একে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’, ‘গুরুতর রাজনৈতিক ভুল’ এবং ‘অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, জনগণ তাদের অধিকার খর্ব করার মতো পদক্ষেপ কখনোই মেনে নেবে না।
খাইবার পাখতুনখোয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইমরান খানের রাজনৈতিক দল পিটিআইয়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
কারাবন্দি ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা
একসময় পাকিস্তানের জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকা এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি রয়েছেন। একই বছরের মে মাসে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভের পর তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সহিংসতায় উসকানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা করা হয়।
ইমরান খান ও তাঁর আইনজীবীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলো করা হয়েছে এবং এর লক্ষ্য তাঁর জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দেওয়া।
বিরোধীদের বড় ধরনের বিক্ষোভ এড়াতে পাকিস্তান সরকার পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে দলটির দাবির বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি পিটিআই-শাসিত প্রদেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়েও মতবিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ৪ অক্টোবর আলোচনা ভেঙে পড়ে এবং বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি পাকিস্তানের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তান থেকে ছড়িয়ে পড়া সশস্ত্র তৎপরতার কারণে খাইবার পাখতুনখোয়া ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে হামলার ঘটনা বেড়েছে।
তবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগে পাকিস্তানের সমালোচনা করেছে কাবুল।
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের জেরে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং মার্চে যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী নিরাপত্তা সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এরপরও বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট—এই তিনটি চ্যালেঞ্জের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন জরুরি পদক্ষেপ দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ সংবাদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















