সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরাইলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে সহ-পাইলটের হামলার শিকার হওয়ার পরও ককপিটের নিয়ন্ত্রণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে অন্য ক্রু ও যাত্রীদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেন তিনি। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বুধবারের ঘটনার পর শুক্রবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলেন মাচ্ছার। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংকটময় মুহূর্তে তার প্রধান চিন্তা ছিল বিমানের যাত্রীদের নিরাপত্তা। তার ভাষায়, “আমি ওই মানুষগুলোকে মরতে দিতে পারি না।”
আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খুললেন
ঘটনার সময় বিমানের ককপিটে মাচ্ছারের ওপর হামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। একই সময়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
মাচ্ছার জানান, প্রচণ্ড আঘাতের কারণে একপর্যায়ে তিনি পড়ে যান। তখন তার মনে হয় বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ককপিটের দরজা খুলে দেওয়াকেই শেষ সুযোগ হিসেবে দেখেন তিনি।
তিনি বলেন, আহত অবস্থাতেও দরজাটি খুলতে সক্ষম হন। এরপর বিমানের যাত্রী ও অন্য ক্রুরা ককপিটে প্রবেশ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন।
পরে বিমানটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে। বিমানের অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন ইসরাইলি নাগরিক। পরে তাদের একটি বিকল্প বিমানে করে ইসরাইলে পাঠানো হয়।
এক মিনিটে ১৭ হাজার ফুট নিচে
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় বিমানটি মাত্র এক মিনিটে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়। যাত্রীরাও বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে দেখে ককপিটের দিকে ছুটে যান বলে জানা গেছে।
তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ ও পুরো পরিস্থিতি এখনো তদন্তাধীন। সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে পাইলটের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বললেন গারগাশ
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ শুক্রবার ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ঘটনার চূড়ান্ত কারণ ও উদ্দেশ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখনো বাকি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত’ ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বিমানের ক্রুদের উদ্দেশে আত্মঘাতী বক্তব্যও দিয়েছিলেন।
নেতানিয়াহু আরও জানান, অভিযুক্ত সহ-পাইলট ওমানের নাগরিক। ইসরাইলগামী ফ্লাইটে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালনের অনুমতি পেয়েছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।
মোদির সঙ্গে কথা পাইলটের
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। সংকটের মুহূর্তে কীভাবে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সে বিষয়েও মোদিকে জানান তিনি।
মাচ্ছার জানান, দীর্ঘ ১৭ বছরের বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা তাকে পরিস্থিতির গুরুত্ব দ্রুত বুঝতে সহায়তা করে। এর মধ্যে ১১ বছর তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঘটনার ভয়াবহ মুহূর্তে তিনি হিন্দু দেবতা হনুমানের মন্ত্র পাঠ করছিলেন বলেও জানান। তার ভাষায়, “আমি জানি, ঈশ্বরই আমাকে বাঁচিয়েছেন।”
পাইলট-যাত্রীদের প্রশংসা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাধারণ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পাইলট, ক্রু ও যাত্রীদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে। তাদের মতে, তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও মাচ্ছারের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেছেন, তার পদক্ষেপ বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও পাইলট ও যাত্রীদের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
ফ্লাইদুবাইয়ের ইসরাইল রুটে স্থগিতাদেশ
ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই ইসরাইলগামী এবং ইসরাইল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেশ কিছু ইসরাইলি যাত্রী আটকা পড়েন।
শুক্রবার অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইসরাইলের উদ্দেশে একটি বিশেষ ফ্লাইট ছাড়ে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জানিয়েছে, ইসরাইলি বিমান সংস্থা আর্কিয়ার একটি ফ্লাইট তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম এটিকে দেশে ফেরার বিশেষ ফ্লাইট হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এর আগে ইসরাইলের জাতীয় বিমান সংস্থা এল আল তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিতে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ অবতরণের অনুমতি না দেওয়ায় সেই ফ্লাইট বাতিল করা হয় বলে জানিয়েছে এল আল। অনুমোদন পাওয়া গেলে পুনরায় বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানিয়েছে বিমান সংস্থাটি।
এদিকে, ঘটনার সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে হামলার সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো তদন্ত ও অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

















