ঢাকা ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ইতালির প্রলোভনে লিবিয়ায় নির্যাতন, ৫৬ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগে প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ফাইনালে ৪ রানের আক্ষেপ, রানার্সআপ বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দল দুর্নীতি প্রতিরোধে তরুণদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের ডেঙ্গুর এডিস মশা শনাক্ত করবে ঢাবির তৈরি স্মার্ট ফাঁদ ডেঙ্গুতে আরও ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১১৮১ ব্রাহ্মণপাড়া সীমান্তে আটক দুই পুলিশ সদস্যকে ফেরত আনল বিজিবি গাম্বিয়ার উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবি, নিহত অন্তত ১২ হিলারি ক্লিনটনের হাত থেকে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেলেন ড. ইউনূস সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বললেন ট্রাম্প

ডেঙ্গুর এডিস মশা শনাক্ত করবে ঢাবির তৈরি স্মার্ট ফাঁদ

  • নিউজ ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৩০:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৮ Time View

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা শনাক্ত ও গণনার জন্য স্বয়ংক্রিয় এবং ইন্টারনেট-সংযুক্ত বিশেষ ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল গবেষক। ‘ম্যাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামের এই যন্ত্রটি শব্দের মাধ্যমে মশাকে আকৃষ্ট করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ধরা পড়া মশার প্রজাতি শনাক্ত করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে।

গবেষণাটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে অর্থায়ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা তহবিল।

যেভাবে কাজ করবে স্মার্ট মশার ফাঁদ

গবেষকদের তৈরি ফাঁদটি স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দের অনুকরণে ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে। এই শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ এডিস মশা ফাঁদের কাছে এলে ভেতরে থাকা একটি ফ্যান সেগুলোকে টেনে নেয়। পরে মশাগুলো হলুদ আঠালো কাগজে আটকে যায়।

এরপর ফাঁদের ভেতরে থাকা ক্যামেরা আটকে পড়া মশার ছবি তোলে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছবিগুলো ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হলে সেখানে থাকা এআই মডেল মশার প্রজাতি শনাক্ত করে এবং সংখ্যা গণনা করে।

এই ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে একটি ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। ফলে ফাঁদের কাছে সরাসরি না গিয়েও দূর থেকে জানা সম্ভব হবে, কোনো এলাকায় কতগুলো এডিস মশা ধরা পড়ছে।

এডিস মশার বিস্তার সম্পর্কে আগাম ধারণা

গবেষকদের মতে, মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী মশা; পুরুষ মশা মানুষের রক্ত পান করে না। তবে পুরুষ এডিস মশা স্ত্রী মশার আগেই পূর্ণবয়স্ক হয় এবং সাধারণত মশার প্রজননস্থলের কাছাকাছি থাকে।

এ কারণে কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে নতুন করে এডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই তথ্য ব্যবহার করে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

পরীক্ষায় পাঁচ গুণ বেশি মশা ধরেছে

গবেষণাগারে খাঁচার ভেতর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, শব্দযুক্ত ফাঁদটি একই ধরনের শব্দহীন ফাঁদের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছে।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় টানা তিন দিন যন্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহলের মধ্যেও ফাঁদটি সচল ছিল। ওই তিন দিনে এতে মোট ৪৯টি এডিস মশা ধরা পড়ে।

তৈরি করতে খরচ প্রায় ১২ হাজার টাকা

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রাংশ মিলিয়ে প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। তুলনামূলকভাবে মশা জরিপে ব্যবহৃত সিডিসি লাইট ট্র্যাপের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা।

একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেকগুলো ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে বড় পরিসরে ব্যবহার বাড়লে প্রতিটি ফাঁদের পরিচালন ব্যয় কমতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে যন্ত্রটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চালু রাখা যায়।

২০২৭ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষার পরিকল্পনা

গবেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে, তার একটি আগাম মানচিত্র তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে ফাঁদটিকে সৌরশক্তিতে চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে গবেষকদের। পাশাপাশি ওয়াই-ফাই ছাড়াই দূরত্বে তথ্য পাঠানোর জন্য দীর্ঘপাল্লার রেডিও তরঙ্গভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা যুক্ত করা এবং যন্ত্রটিকে রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করার কাজ চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকেরা এ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন।

দেশের স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক আরও খবর পড়ুন তথ্য প্রকাশ ওয়েবসাইটে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Editorial Desk

জনপ্রিয় সংবাদ

ইতালির প্রলোভনে লিবিয়ায় নির্যাতন, ৫৬ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগে প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

ডেঙ্গুর এডিস মশা শনাক্ত করবে ঢাবির তৈরি স্মার্ট ফাঁদ

Update Time : ০৪:৩০:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা শনাক্ত ও গণনার জন্য স্বয়ংক্রিয় এবং ইন্টারনেট-সংযুক্ত বিশেষ ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল গবেষক। ‘ম্যাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামের এই যন্ত্রটি শব্দের মাধ্যমে মশাকে আকৃষ্ট করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ধরা পড়া মশার প্রজাতি শনাক্ত করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে।

গবেষণাটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে অর্থায়ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা তহবিল।

যেভাবে কাজ করবে স্মার্ট মশার ফাঁদ

গবেষকদের তৈরি ফাঁদটি স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দের অনুকরণে ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে। এই শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ এডিস মশা ফাঁদের কাছে এলে ভেতরে থাকা একটি ফ্যান সেগুলোকে টেনে নেয়। পরে মশাগুলো হলুদ আঠালো কাগজে আটকে যায়।

এরপর ফাঁদের ভেতরে থাকা ক্যামেরা আটকে পড়া মশার ছবি তোলে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছবিগুলো ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হলে সেখানে থাকা এআই মডেল মশার প্রজাতি শনাক্ত করে এবং সংখ্যা গণনা করে।

এই ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে একটি ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। ফলে ফাঁদের কাছে সরাসরি না গিয়েও দূর থেকে জানা সম্ভব হবে, কোনো এলাকায় কতগুলো এডিস মশা ধরা পড়ছে।

এডিস মশার বিস্তার সম্পর্কে আগাম ধারণা

গবেষকদের মতে, মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী মশা; পুরুষ মশা মানুষের রক্ত পান করে না। তবে পুরুষ এডিস মশা স্ত্রী মশার আগেই পূর্ণবয়স্ক হয় এবং সাধারণত মশার প্রজননস্থলের কাছাকাছি থাকে।

এ কারণে কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে নতুন করে এডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই তথ্য ব্যবহার করে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

পরীক্ষায় পাঁচ গুণ বেশি মশা ধরেছে

গবেষণাগারে খাঁচার ভেতর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, শব্দযুক্ত ফাঁদটি একই ধরনের শব্দহীন ফাঁদের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছে।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় টানা তিন দিন যন্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহলের মধ্যেও ফাঁদটি সচল ছিল। ওই তিন দিনে এতে মোট ৪৯টি এডিস মশা ধরা পড়ে।

তৈরি করতে খরচ প্রায় ১২ হাজার টাকা

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রাংশ মিলিয়ে প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। তুলনামূলকভাবে মশা জরিপে ব্যবহৃত সিডিসি লাইট ট্র্যাপের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা।

একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেকগুলো ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে বড় পরিসরে ব্যবহার বাড়লে প্রতিটি ফাঁদের পরিচালন ব্যয় কমতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে যন্ত্রটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চালু রাখা যায়।

২০২৭ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষার পরিকল্পনা

গবেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে, তার একটি আগাম মানচিত্র তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে ফাঁদটিকে সৌরশক্তিতে চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে গবেষকদের। পাশাপাশি ওয়াই-ফাই ছাড়াই দূরত্বে তথ্য পাঠানোর জন্য দীর্ঘপাল্লার রেডিও তরঙ্গভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা যুক্ত করা এবং যন্ত্রটিকে রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করার কাজ চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকেরা এ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন।

দেশের স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক আরও খবর পড়ুন তথ্য প্রকাশ ওয়েবসাইটে।