চট্টগ্রাম বন্দরে কম শুল্কের পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নাট-বল্টু, বিয়ারিং ও অন্যান্য পণ্য আনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির আটটি ঘটনা শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
শনিবার এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিআইসি ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের এআইআর শাখা যৌথ অভিযান চালিয়ে কনটেইনারগুলো কায়িকভাবে পরীক্ষা করে পণ্য ঘোষণায় অসংগতি ও শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার তথ্য পায়।
ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে কৃষি যন্ত্রপাতি, টুথপিক, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার, রাবার বুশ ও স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে পরীক্ষায় এসব চালানে নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, ফেস ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, নিষিদ্ধ ক্রিম, লেজার লাইট, গাড়ির ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, বিয়ারিং, নাট-বল্টু, স্ক্রু ও পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানারের মতো পণ্য পাওয়া যায়।
পাওয়ার স্প্রেয়ারের চালানে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকি
ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কনটেইনার পরীক্ষা করে স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও কালো চুলের শ্যাম্পুসহ বিভিন্ন অঘোষিত পণ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ঘোষণায় উল্লেখ করা ওজনের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি অতিরিক্ত পণ্য শনাক্ত হয়। এ চালানে আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছে এনবিআর।
টুথপিকের পরিবর্তে প্রসাধনী, রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা
পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ কর্পোরেশন চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি টুথপিক। বাকি পণ্যের মধ্যে গোরি বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, সানগ্লাস ও ডিলে স্প্রে শনাক্ত করা হয়।
এ চালানে আনুমানিক ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ফ্লেক্স ব্যানারেও অনিয়ম
ঢাকার এইচ.আর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিন রাবার বুশ আমদানির ঘোষণা দিলেও পরীক্ষায় প্রকৃত রাবার বুশ পাওয়া যায় ৬ হাজার ৬২৫ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংসহ বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ ছিল। এ ঘটনায় আনুমানিক ৪৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য দিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স চীন থেকে ২৩ হাজার ৬১৮ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কনটেইনার পরীক্ষা করে মাত্র ৩ হাজার ১৬০ কেজি পেপার পাওয়া যায়। বাকি পণ্যের বড় অংশের মধ্যে উচ্চ শুল্কের পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার শনাক্ত করা হয়। এ চালানে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
নাট-বল্টু ও বিয়ারিংয়ের চালানে শুল্ক ফাঁকির তথ্য
বংশালের নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ এবং ওয়ারীর মোহাম্মাদীয়া ট্রেডের আমদানি চালানেও অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
মোহাম্মাদীয়া ট্রেড ২২ টন স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল ও এক্সকাভেটর গিয়ার আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে পরীক্ষায় ঘোষিত পণ্যের মধ্যে ৩ দশমিক ৮ টন পাওয়া যায়। একই কনটেইনারে অতিরিক্ত ২২ হাজার ১১৩ কেজি নাট, বল্টু ও স্ক্রু শনাক্ত হয়। এ ঘটনায় আনুমানিক ৩২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল।
নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের চালানে পাওয়া যায় ১৭ হাজার ৫৯২ কেজি নাট-বল্টু, ২ হাজার ৭৮৭ কেজি ভারী রোলিং বিয়ারিং এবং ২ হাজার ৩৩৬ কেজি ঘূর্ণনযোগ্য চেয়ারের গ্যাস লিফট সিলিন্ডার। এ চালানে আনুমানিক ৪২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য জানিয়েছে এনবিআর।
কনটেইনারের সিল বদল ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ
কাফ কর্পোরেশনের নজরদারিতে থাকা আরেকটি কনটেইনার অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার তথ্যও পেয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কনটেইনারটি এএসওয়াইসিইউডিএ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক করা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত কায়িক পরীক্ষার তারিখের আগে ১৯ সেপ্টেম্বর সেটি কিপ ডাউন করা হয়। এ সময় বিল অব লেডিংয়ে উল্লেখ করা মূল সিল ভেঙে অন্য একটি সিল লাগানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র যাচাই করে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করার তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে এনবিআর। পরে কনটেইনারটি নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে জব্দ করা হয়।
কাস্টমস আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি
এনবিআর জানিয়েছে, ডিজিটাল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতিতে নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আমদানি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
আরও পড়ুন: আমদানি-রপ্তানি ও জাতীয় রাজস্বসংক্রান্ত আরও খবর | অর্থনীতি ও বাণিজ্যবিষয়ক সংবাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক | তথ্য প্রকাশ 


















