নিজের প্রয়োজনে টিআইএন নিবন্ধন করলেও পরে তা আর দরকার নাও হতে পারে। তবে শুধু প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই টিআইএন বাতিল করা যায় না। নির্দিষ্ট আইনগত শর্ত পূরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আবেদন করতে হয়।
নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যাংকিং সেবা, ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের জন্য অনেকেই ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন নিবন্ধন করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলালে এই নম্বরের প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে পারে। তখন টিআইএন সক্রিয় রাখার কারণে আয়কর রিটার্ন দাখিলসহ বিভিন্ন কর-সংক্রান্ত দায়িত্ব নিয়ে অনেকে উদ্বিগ্ন হন।
তবে টিআইএন থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে কর দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। কার রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক, কার কর দিতে হবে এবং কার নিবন্ধন বাতিলের সুযোগ রয়েছে—এসব বিষয় নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়, অবস্থান ও প্রচলিত আইনের ওপর।
কোন কারণে টিআইএন বাতিল করা যেতে পারে?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬২ ধারায় করদাতার নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে বিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে কয়েকটি পরিস্থিতিতে টিআইএন বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
১. করযোগ্য আয় না থাকলে: কোনো ব্যক্তির করযোগ্য আয় না থাকলে এবং আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিলের শর্ত পূরণ হলে আবেদন বিবেচিত হতে পারে। তবে আয় কমে যাওয়া বা করযোগ্য আয় না থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিআইএন বাতিল হয় না।
২. রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা না থাকলে: কোনো ব্যক্তি আর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে বাধ্য না হলে এবং আইন অনুযায়ী অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করতে পারেন।
৩. একই ব্যক্তির নামে একাধিক টিআইএন থাকলে: ভুলবশত একাধিক নিবন্ধন তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় নিবন্ধনটি রেখে অন্যটি বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
৪. ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হলে: কোনো প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে গেলে বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে প্রযোজ্য নিয়মে নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আইনগত অবস্থা ও বকেয়া দায় যাচাই করা প্রয়োজন।
৫. বাংলাদেশে আয়-উপার্জনের কার্যক্রম বন্ধ করলে: কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে আয়-উপার্জনমূলক কার্যক্রম বন্ধ করলে তার পরিস্থিতি ও আইনগত যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন বিবেচিত হতে পারে।
৬. অন্যান্য আইনগত কারণে: ভুলবশত নিবন্ধন তৈরি হওয়া বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে এসব পরিস্থিতির কোনো একটি ঘটলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিআইএন বাতিল হয়ে যায় না। আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনি শর্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
টিআইএন বাতিলের আবেদন করবেন যেভাবে
টিআইএন বাতিলের জন্য প্রথমে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থান যাচাই করা জরুরি। এরপর সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে জানতে হবে।
প্রথম ধাপ: যোগ্যতা যাচাই। কেন টিআইএন বাতিল করতে চান, সেই কারণটি আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য কি না তা যাচাই করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত। টিআইএন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বাতিলের কারণের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নির্দেশনা দেখুন অথবা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে যোগাযোগ করে আবেদন জমা দেওয়ার বর্তমান পদ্ধতি জেনে নিন।
এনবিআরের ওয়েবসাইট: https://nbr.gov.bd/
চতুর্থ ধাপ: আবেদন ও যাচাই। আবেদন জমা দেওয়ার পর কর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করতে পারে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত নথিও চাওয়া হতে পারে।
টিআইএন বাতিল করতে কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?
আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথির তালিকা ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে প্রস্তুত রাখতে পারেন—
- টিআইএন সনদ বা নিবন্ধন নম্বরের প্রমাণ।
- জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
- নিবন্ধন বাতিলের কারণ উল্লেখ করে আবেদনপত্র।
- ব্যবসা বন্ধ বা প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির প্রমাণ, যদি প্রযোজ্য হয়।
- প্রাসঙ্গিক আয়কর রিটার্ন বা কর পরিশোধের নথি, যদি চাওয়া হয়।
- সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিল।
সব আবেদনকারীর জন্য একই ধরনের নথি বা নির্দিষ্ট সংখ্যক বছরের শূন্য রিটার্ন বাধ্যতামূলক—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা জেনে নেওয়াই ভালো।
টিআইএন বাতিল হলে কি আর রিটার্ন দিতে হবে না?
টিআইএন বাতিলের আবেদন অনুমোদিত হলে নিবন্ধনের অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে অনুমোদন বা বাতিলের প্রমাণপত্রও সংগ্রহ করতে হবে।
তবে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার অর্থ এই নয় যে আগের সব কর-সংক্রান্ত দায় শেষ হয়ে গেছে। বাতিলের আগের সময়ের কোনো বকেয়া কর, বকেয়া রিটার্ন বা অন্য কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলে তা নিষ্পত্তি করতে হতে পারে।
একইভাবে, ভবিষ্যতে রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ের আইন ও করদাতার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
আরও পড়ুন: [আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে কী হতে পারে—Totthoprokash.com-এর প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন লিংক যুক্ত করুন]
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা জানা জরুরি
শুধু আয়কর রিটার্ন দাখিলের ঝামেলা এড়াতে তাড়াহুড়ো করে টিআইএন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ভবিষ্যতে সম্পদ কেনা, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা অন্য কোনো কাজে এই নম্বর প্রয়োজন হতে পারে কি না, তা আগে বিবেচনা করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, টিআইএন বাতিলের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আগের কর-সংক্রান্ত দায় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















