লুলার জয়ের পরও অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন বিরোধী প্রার্থী, পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ পাওয়ার দাবিও করেছেন তিনি।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছে ডানপন্থী লিবারেল পার্টি। তবে দলটির প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো নির্বাচনে নিজের পরাজয় নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। অন্যদিকে, নির্বাচনে জয়ী বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেকটোরাল কোর্ট (টিএসই) ঘোষিত নির্বাচনী ফল মেনে নেওয়ার কথা জানায় লিবারেল পার্টি। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উত্থাপিত উদ্বেগগুলোর সমাধানে রাজনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেছে দলটি।
প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় ভোটের ব্যবধান ঘুরিয়ে দিয়ে জয় পান ৮০ বছর বয়সী লুলা দা সিলভা। ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে প্রায় ৪৪ লাখ বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি। এ জয়ের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা।
তার জয়ের পর সমর্থকেরা বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে উদ্যাপন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও লুলার সমর্থকদের ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়।
নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছিলেন লুলা। অন্যদিকে, এসব কর্মসূচির অর্থায়ন ও সরকারের আর্থিক নীতি নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন ফ্লাভিও।
নির্বাচনের দিন কয়েকটি শহরে পরিবহন সমস্যার কারণে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে অসুবিধা হচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে লুলার অনুরোধে সারা দেশে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘নোংরা কৌশল’ বলে আখ্যা দেন এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে, প্রবল বৃষ্টির কারণে কিছু অঞ্চলে ভোটকেন্দ্র খোলা রাখার সময় বাড়ানোর অনুরোধ ফ্লাভিও নিজেও জানিয়েছিলেন। নির্বাচনী আদালতের প্রধান কাসিও নুনেস মার্কেসের বক্তব্য অনুযায়ী, ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে কিছু সমস্যা তৈরি হলেও এতে চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তন আসেনি।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে ফ্লাভিও বলসোনারো দাবি করেন, পুলিশ তাকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং দেশ ছাড়তে নিষেধ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি এ নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তার ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর একটি মন্তব্যের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নির্বাচনের দুই দিন আগে একটি মার্কিন পডকাস্টে এদুয়ার্দো বলেছিলেন, নির্বাচনে তার ভাই জয়ী না হলে তিনি যেন দেশ ছেড়ে চলে যান, সেটিই তার পছন্দ। ভাইয়ের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের প্রসঙ্গেই তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে ব্রাজিলের পুলিশ। তার বাবা জইর বলসোনারোকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ নামের একটি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রের অর্থায়নকে কেন্দ্র করে এ তদন্ত চলছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ফ্লাভিও জানিয়েছেন, দেশ ছাড়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তিনি পাসপোর্ট জমা দিয়ে নিজের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নেবেন।
লুলার জয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, রাশিয়া, চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকেও অভিনন্দন বার্তা এসেছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রাজিলের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি নির্বাচনটিকে খারাপ বলে মন্তব্য করেন এবং কারচুপির সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে তার এ বক্তব্যের পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো প্রমাণের উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লাতিন আমেরিকার কয়েকটি ডানপন্থী সরকারও লুলার জয় মেনে নিয়েছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা ফ্লাভিওর প্রতি সমর্থন জানালেও ভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রকাশ করা মতকে সম্মান করার কথা বলেছেন।
লুলার জয়ের পর ব্রাজিলের শেয়ারবাজারে প্রায় ১৭ শতাংশ দরপতন ঘটে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যায়।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সামাজিক ব্যয়সংক্রান্ত নীতি নিয়ে উদ্বেগকে বাজারের এ প্রতিক্রিয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাজারের ওঠানামার পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারে লুলা বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা ও ব্যয় কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এসব প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে ফ্লাভিও অভিযোগ করেন, লুলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।
ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী ফল নিয়ে আপত্তি ব্রাজিলের রাজনীতিতে আগের একটি বিতর্কের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারো ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে লুলার শপথ গ্রহণের এক সপ্তাহ পর জইর বলসোনারোর শত শত সমর্থক সরকারি ভবনে হামলা চালান। তাদের একাংশ সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ দাবি করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যুত্থানচেষ্টার দায়ে জইর বলসোনারো বর্তমানে গৃহবন্দী অবস্থায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
এদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারো নিজেকে বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ফলে নির্বাচনী ফল মেনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পরও ব্রাজিলের রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: বার্তা সংস্থা এএফপি।
আরও পড়ুন: ব্রাজিলের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সংবাদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















