আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এর ফলে আদালটির আর্থিক লেনদেন, প্রযুক্তিসেবা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আদালটির স্বাধীনতা রক্ষায় পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং কানাডা, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ কয়েকটি দেশ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। এর আগে আইসিসির কয়েকজন বিচারক ও কৌঁসুলির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও এবার পুরো প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ডলারের ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিনিষেধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আদালটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গুটিয়ে নেওয়ার জন্য ছয় মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান ইইউর
১০ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আদালতটির স্বাধীনতা ও কার্যক্রম সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে জোটটি।
ইইউর মতে, আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আইসিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আদালতটির ওপর রাজনৈতিক চাপ বা বাইরের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে ইইউ। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে ছয় মাসের সময়সীমা থাকায় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইসিসির পাশে আট দেশের যৌথ অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে ৯ অক্টোবর যৌথ বিবৃতি দিয়েছে কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য।
দেশগুলো আইসিসির স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাদের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আদালটির কাজ, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবারের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দেশগুলো।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কী বলছে আইসিসি?
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে আইসিসি। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে আদালতটি বলেছে, এ পদক্ষেপ ন্যায়বিচারের পথ বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর আঘাত।
আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে জানিয়েছেন, আদালতটি স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। তবে কার্যক্রম সচল রাখতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সম্পদ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আদালতটি।
আদালতের মতে, বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রক্ষার নয়; আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও গুরুতর অপরাধের বিচারের ব্যবস্থাও এর সঙ্গে জড়িত।
কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ?
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আইসিসির কিছু তদন্ত ও বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে। বিশেষ করে গাজা পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ওয়াশিংটনের আপত্তি আরও স্পষ্ট হয়। আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের অংশ।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, আদালতটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে অন্যায্যভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, আইসিসি ও এর সমর্থক দেশগুলোর অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ থাকা জরুরি।
সামনে কী হতে পারে?
নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশন আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানোর সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ বা ব্লকিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও রয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিদেশি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়তে পারে। অন্যদিকে, বিকল্প আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে আদালতটি কতটা কার্যকরভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে আইসিসির কার্যক্রম সচল রাখা, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই আন্তর্জাতিক মহলের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















