ঢাকা ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ছাতকে ২১ বোতল বিদেশি মদসহ দুই যুবক গ্রেপ্তার, জব্দ নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল ছাতকে মাদক মামলায় দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ ভবনের একাধিক কক্ষে চুরি, উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা ইপিজেড থানার ওসির বিরুদ্ধে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ যশোরের শার্শায় ধানক্ষেত থেকে ওয়ান শুটার পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ গণহত্যাকারীদের এই দেশে রাজনীতির সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ২৮ নভেম্বর মাদকমুক্ত ও সচেতন সমাজ গঠনে খেলাধুলার বিকল্প নেই : ভূমি ও পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা জরুরি: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় ঘাতক লরি চালক গ্রেফতার
অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয়তা, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য ও বদলির আদেশ বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ

ইপিজেড থানার ওসির বিরুদ্ধে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কথিত ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি এবং বদলির আদেশ বাস্তবায়নে অনীহাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক সদস্য ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র এসব অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, ওসি আতিকুর রহমান ইপিজেড থানায় যোগদানের পর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বরং চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছে। পাশাপাশি নিজ জেলা কুমিল্লার কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সিমেন্ট ক্রসিং, বন্দরটিলা, ব্যারিস্টার কলেজ, মাইলের মাথা, সি-ম্যাস হোস্টেল ও সল্টগোলা এলাকায় দিনদুপুরে মোবাইল ছিনতাই, চুরি এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

এ ছাড়া বিমানবন্দর সড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর রাতের বেলায় মোবাইল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক কেবল চুরির ঘটনাও বেড়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, ব্যারিস্টার কলেজ থেকে মাইলের মাথা পর্যন্ত সড়কের পূর্ব পাশে সকাল ৭টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৩টার দিকে বিভিন্ন সময়ে ১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র তিন তাসের আসর বসায়। অভিযোগ রয়েছে, এ চক্রটি সাধারণ পথচারী ও পোশাকশ্রমিকদের কাছ থেকে কৌশলে মোবাইল ফোন ও টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়।

আবাসিক এলাকায় মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা

সড়কের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যারিস্টার কলেজের প্রধান সড়কসংলগ্ন এস এ পরিবহনের পাঁচতলা ফরিদা ম্যানশন এবং ফরিদা ভবনের পাশের গলিতে ইয়াবা ও গাঁজার কারবার চলছে। এসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও বেড়েছে বলে তাঁদের দাবি।

এ ছাড়া আবাসিক ভবন ও বাসাবাড়ির পানির মোটর, বৈদ্যুতিক তার এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জুট ব্যবসায়ী ও অবৈধ কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের দুই ইপিজেড এলাকার জুট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা মাসোহারা আদায় করা হয়। পাশাপাশি আকমল আলী বেড়িবাঁধ এলাকায় অবৈধ পণ্য ও কালো তেল পাচারের সঙ্গে জড়িত কারবারিদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত একজন ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং এ অর্থের সঙ্গে ওসির কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইপিজেড থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

চৌধুরী মার্কেটের সামনে ক্ষুদ্র চা-দোকানি সাইফুলের দোকান থেকে লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরির অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ফ্রি-পোর্ট সৈকত মার্কেটের মধুবন মিষ্টির দোকানসংলগ্ন ছাদে উঠে ৩-৪ জনের একটি চোরচক্র ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের তার চুরির চেষ্টা করে। এ সময় সৈকত মার্কেট ও গাজী কমপ্লেক্সের দারোয়ান বাবু ও তাঁর ভাই বিষয়টি দেখতে পেয়ে চোরদের ধরতে এগিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, চোরেরা চাকু দেখিয়ে তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং ইটপাটকেল ছুড়ে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে, গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আকমল আলী এলাকার সাওয়াদ বিল্ডিংয়ের ইনচার্জ রহমত জানান, সংস্কারাধীন ওই ভবন থেকে রাতের আঁধারে প্রায় লক্ষাধিক টাকার ওয়্যারিং তার চুরি হয়েছে।

পরপর এসব চুরির ঘটনায় এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।

পুলিশ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ওসি আতিকুর রহমান যোগদানের পর থানার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, ডিউটি বণ্টন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নিজ জেলা কুমিল্লার কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ প্রাধান্য দিচ্ছেন।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তালিকায় রয়েছেন—

১. এসআই শাহিন মিয়া
২. এসআই মামুন
৩. এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরী
৪. এএসআই আব্দুর রহমান পাটোয়ারী
৫. এএসআই পলাশ কুমার হাজারী
৬. ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আব্দুল ওদুদ চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন।

তাঁদের দাবি, দায়িত্ব বণ্টন ও সুযোগ-সুবিধায় এমন পক্ষপাতিত্বের কারণে থানার অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বিষয়টি অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে।

থানার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর নতুন তদন্ত কর্মকর্তা (তদন্ত ওসি) পদায়ন নিয়ে ওসি আতিকুর রহমানের অনীহার অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এসআই শাহিন মিয়াকে সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তদন্ত ওসির দায়িত্বও পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টনের প্রশাসনিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে পুলিশ সদস্যদের বদলির আদেশ জারি হলেও কথিত প্রভাব কিংবা থানায় লোকবল সংকটের অজুহাতে সেসব আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব করা হয়। বিশেষ করে ওসির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ বেশি।

বন্দর জোনের বদলি আদেশসংক্রান্ত সূত্রে জানা যায়—

  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের ২২৮/২৬ নম্বর আদেশে এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরীকে পতেঙ্গা থানায় বদলি করা হয়।
  • স্মারক নম্বর সিএমপি/আরও(সিআরও)/বদলি/আদেশ ২৭৭/১(১২), তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০২৫ অনুযায়ী এএসআই আব্দুর রহমান পাটোয়ারীকে উত্তর বিভাগে বদলি করা হয়।
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের ৪৩/২৬ নম্বর আদেশে এসআই কামরুজ্জামানকে ইপিজেড থানা থেকে পতেঙ্গা মডেল থানায় বদলি করা হয়।

এ ছাড়া অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২১-২০২২ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানায় কর্মরত থাকাকালে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গায়েবি মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছিল ওসি আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, “ফোনে তো সব বলা সম্ভব নয়। থানায় আসেন, এলাকায় খোঁজ নেন। আপনারা সাংবাদিকরা তো অনেক নিউজ করলেন। আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিযোগ দিয়েছেন, উনারা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।”

একের পর এক চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার, অবৈধ ব্যবসা থেকে কথিত মাসোহারা আদায় এবং পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগে ইপিজেড থানা এলাকার জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে এলাকায় চুরি-ছিনতাই ও মাদক কারবার বন্ধে কার্যকর পুলিশি অভিযান জোরদার করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Editorial Desk

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাতকে ২১ বোতল বিদেশি মদসহ দুই যুবক গ্রেপ্তার, জব্দ নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল

অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয়তা, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য ও বদলির আদেশ বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ

ইপিজেড থানার ওসির বিরুদ্ধে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

Update Time : ০৩:৩২:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কথিত ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি এবং বদলির আদেশ বাস্তবায়নে অনীহাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক সদস্য ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র এসব অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, ওসি আতিকুর রহমান ইপিজেড থানায় যোগদানের পর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বরং চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছে। পাশাপাশি নিজ জেলা কুমিল্লার কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সিমেন্ট ক্রসিং, বন্দরটিলা, ব্যারিস্টার কলেজ, মাইলের মাথা, সি-ম্যাস হোস্টেল ও সল্টগোলা এলাকায় দিনদুপুরে মোবাইল ছিনতাই, চুরি এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

এ ছাড়া বিমানবন্দর সড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর রাতের বেলায় মোবাইল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক কেবল চুরির ঘটনাও বেড়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, ব্যারিস্টার কলেজ থেকে মাইলের মাথা পর্যন্ত সড়কের পূর্ব পাশে সকাল ৭টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৩টার দিকে বিভিন্ন সময়ে ১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র তিন তাসের আসর বসায়। অভিযোগ রয়েছে, এ চক্রটি সাধারণ পথচারী ও পোশাকশ্রমিকদের কাছ থেকে কৌশলে মোবাইল ফোন ও টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়।

আবাসিক এলাকায় মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা

সড়কের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যারিস্টার কলেজের প্রধান সড়কসংলগ্ন এস এ পরিবহনের পাঁচতলা ফরিদা ম্যানশন এবং ফরিদা ভবনের পাশের গলিতে ইয়াবা ও গাঁজার কারবার চলছে। এসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও বেড়েছে বলে তাঁদের দাবি।

এ ছাড়া আবাসিক ভবন ও বাসাবাড়ির পানির মোটর, বৈদ্যুতিক তার এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জুট ব্যবসায়ী ও অবৈধ কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের দুই ইপিজেড এলাকার জুট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা মাসোহারা আদায় করা হয়। পাশাপাশি আকমল আলী বেড়িবাঁধ এলাকায় অবৈধ পণ্য ও কালো তেল পাচারের সঙ্গে জড়িত কারবারিদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত একজন ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং এ অর্থের সঙ্গে ওসির কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইপিজেড থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

চৌধুরী মার্কেটের সামনে ক্ষুদ্র চা-দোকানি সাইফুলের দোকান থেকে লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরির অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ফ্রি-পোর্ট সৈকত মার্কেটের মধুবন মিষ্টির দোকানসংলগ্ন ছাদে উঠে ৩-৪ জনের একটি চোরচক্র ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের তার চুরির চেষ্টা করে। এ সময় সৈকত মার্কেট ও গাজী কমপ্লেক্সের দারোয়ান বাবু ও তাঁর ভাই বিষয়টি দেখতে পেয়ে চোরদের ধরতে এগিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, চোরেরা চাকু দেখিয়ে তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং ইটপাটকেল ছুড়ে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে, গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আকমল আলী এলাকার সাওয়াদ বিল্ডিংয়ের ইনচার্জ রহমত জানান, সংস্কারাধীন ওই ভবন থেকে রাতের আঁধারে প্রায় লক্ষাধিক টাকার ওয়্যারিং তার চুরি হয়েছে।

পরপর এসব চুরির ঘটনায় এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।

পুলিশ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ওসি আতিকুর রহমান যোগদানের পর থানার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, ডিউটি বণ্টন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নিজ জেলা কুমিল্লার কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ প্রাধান্য দিচ্ছেন।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তালিকায় রয়েছেন—

১. এসআই শাহিন মিয়া
২. এসআই মামুন
৩. এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরী
৪. এএসআই আব্দুর রহমান পাটোয়ারী
৫. এএসআই পলাশ কুমার হাজারী
৬. ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আব্দুল ওদুদ চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন।

তাঁদের দাবি, দায়িত্ব বণ্টন ও সুযোগ-সুবিধায় এমন পক্ষপাতিত্বের কারণে থানার অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বিষয়টি অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে।

থানার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর নতুন তদন্ত কর্মকর্তা (তদন্ত ওসি) পদায়ন নিয়ে ওসি আতিকুর রহমানের অনীহার অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এসআই শাহিন মিয়াকে সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তদন্ত ওসির দায়িত্বও পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টনের প্রশাসনিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে পুলিশ সদস্যদের বদলির আদেশ জারি হলেও কথিত প্রভাব কিংবা থানায় লোকবল সংকটের অজুহাতে সেসব আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব করা হয়। বিশেষ করে ওসির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ বেশি।

বন্দর জোনের বদলি আদেশসংক্রান্ত সূত্রে জানা যায়—

  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের ২২৮/২৬ নম্বর আদেশে এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরীকে পতেঙ্গা থানায় বদলি করা হয়।
  • স্মারক নম্বর সিএমপি/আরও(সিআরও)/বদলি/আদেশ ২৭৭/১(১২), তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০২৫ অনুযায়ী এএসআই আব্দুর রহমান পাটোয়ারীকে উত্তর বিভাগে বদলি করা হয়।
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের ৪৩/২৬ নম্বর আদেশে এসআই কামরুজ্জামানকে ইপিজেড থানা থেকে পতেঙ্গা মডেল থানায় বদলি করা হয়।

এ ছাড়া অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২১-২০২২ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানায় কর্মরত থাকাকালে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গায়েবি মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছিল ওসি আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, “ফোনে তো সব বলা সম্ভব নয়। থানায় আসেন, এলাকায় খোঁজ নেন। আপনারা সাংবাদিকরা তো অনেক নিউজ করলেন। আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিযোগ দিয়েছেন, উনারা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।”

একের পর এক চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার, অবৈধ ব্যবসা থেকে কথিত মাসোহারা আদায় এবং পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগে ইপিজেড থানা এলাকার জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে এলাকায় চুরি-ছিনতাই ও মাদক কারবার বন্ধে কার্যকর পুলিশি অভিযান জোরদার করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।