কেনিয়ার আলোচিত শাকাহোলা বন হত্যাকাণ্ডের মামলায় স্বঘোষিত ধর্মপ্রচারক পল ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১৯১ জনকে হত্যার অভিযোগে সোমবার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। দেশটির মোম্বাসার একটি আদালতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ রায় দেওয়া হবে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ধর্মীয় বিশ্বাসের অপব্যবহার করে অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীরা। নিহতদের অধিকাংশই শিশু। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ‘শাকাহোলা বন হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে কেনিয়ার পর্যটনকেন্দ্র মালিন্দির অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে শাকাহোলা বনে শত শত মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধর্মীয় গোষ্ঠীর আড়ালে সংঘটিত এই ভয়াবহ ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এ ধরনের আরও আন্তর্জাতিক খবর পড়তে ভিজিট করুন তথ্য প্রকাশের আন্তর্জাতিক সংবাদ বিভাগে।
২০২৪ সালে ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীরা ১৯১টি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। পৃথক মামলায় তার বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগও রয়েছে। সেসব অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি।
অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, যিশুর সঙ্গে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে উৎসাহিত করেছিলেন ম্যাকেঞ্জি। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শাকাহোলা বনের প্রায় ৮০০ একর জমির একটি খামারে এসব ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচার চলাকালে ১২০ জনেরও বেশি সাক্ষীর বক্তব্য শুনেছেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ম্যাকেঞ্জি পরিকল্পিতভাবে চরম উপবাসের কর্মসূচি পরিচালনা করেছিলেন। সেখানে মৃত্যুর একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা হয়—প্রথমে শিশু, এরপর কিশোর-কিশোরী, নারী এবং সবশেষে পুরুষদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের সংগৃহীত প্রমাণের বরাতে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, শিশুদের মৃত্যুর কারণের মধ্যে অনাহার, অনাহারজনিত শারীরিক জটিলতা, শ্বাসরোধ, গলায় চাপ প্রয়োগ এবং মাথায় আঘাতের বিষয় রয়েছে।
তবে ম্যাকেঞ্জির আইনজীবীরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছেন, মামলাটি মূলত পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, অন্যের কাছ থেকে শোনা বক্তব্য এবং অনির্দিষ্ট ফরেনসিক অনুসন্ধানের ওপর নির্ভরশীল।
যেভাবে সামনে আসে ভয়াবহ ঘটনা
মানবাধিকারকর্মীদের একটি সংগঠন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করার পর শাকাহোলা এলাকার কয়েকজন অনুসারীকে উদ্ধার করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ম্যাকেঞ্জিকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে পুলিশের অভিযানে ওই এলাকায় শত শত অগভীর গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ফলে স্থানীয় মর্গগুলোতে জায়গার সংকট তৈরি হয়। পরিস্থিতির কারণে একপর্যায়ে মরদেহ উদ্ধারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
কেনিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০২৪ সালে জানায়, এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৪২৯-এ পৌঁছেছিল। এখনো কয়েকটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাছের একটি গ্রাম থেকে আরও ৫২টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ আনা হয়।
আগে থেকেই পুলিশের নজরে ছিলেন ম্যাকেঞ্জি
ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে আগেও চরমপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলতে সক্ষম হন তিনি।
২০০৩ সালে তিনি ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে নাইরোবি ও কেনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে গির্জাটির বিভিন্ন শাখা গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে হাজার হাজার মানুষ এর অনুসারী হন। ম্যাকেঞ্জির দাবি, ২০১৯ সালে তিনি গির্জাটি বন্ধ করে দেন।
২০১৭ সালে অনুসারীদের উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হলেও পরে তিনি খালাস পান। ২০১৯ সালে শাকাহোলা এলাকায় দুই শিশুর অনাহারে মৃত্যুর ঘটনায়ও তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
বিচারের অপেক্ষায় নিহতদের স্বজনেরা
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার রায় ঘিরে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে গভীর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সোমবার তাদের অনেকেরই কেনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মোম্বাসার আদালতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ড কেনিয়াজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে যাতে এ ধরনের অপরাধ আর সংঘটিত না হতে পারে, সে জন্য ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
শাকাহোলা বন হত্যাকাণ্ডের বিচার তাই শুধু অভিযুক্তদের দায় নির্ধারণের বিষয় নয়; দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, অনুসারীদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও আন্তর্জাতিক সংবাদ: তথ্য প্রকাশ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















