বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার পরিবেশ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম।
সোমবার জাতীয় সংসদে সফররত ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ক্রিস্টিনা ফিলিপের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, সাম্প্রতিক দুটি অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দল যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা ইতিবাচকভাবে দেখেছে আইপিইউ। সংসদে মতপার্থক্য থাকা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভিন্নমতকে সম্মান করে আলোচনার মাধ্যমে সর্বোত্তম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল শক্তি।
তিনি জানান, সংসদীয় কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন হলে সংসদের অধিবেশনের মেয়াদ বাড়িয়েও কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিরোধী দল কোনো প্রস্তাব দিলে সেটিও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে।
সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, নতুন করে সংবিধান প্রণয়নের পরিবর্তে জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বিদ্যমান সংবিধানে সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত করার পক্ষে বিএনপি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ সীমা, উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মতো বিষয় রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে যেখানে সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রয়োজন, সেখানে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই তা করতে হবে। ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে এমন একটি সংশোধনের প্রত্যাশা রয়েছে, যাতে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ছাড়া সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়।
রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের উদাহরণ তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতার পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও কোলাকুলির বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার এ ধরনের চর্চা সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, সংসদে ভিন্নমত থাকবেই। কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারীকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া এবং তার মতের প্রতি সম্মান দেখানো গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হলে তা করা হবে; আর সমঝোতা না হলে সংসদীয় নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চিফ হুইপ আরও বলেন, রাজনৈতিক বা জাতীয় কোনো সমস্যার সমাধানে সংঘাতের পথ নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ রেখে যেতে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব রয়েছে।
আইপিইউ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের উত্তম চর্চাগুলো কীভাবে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন, সংসদে নারী সদস্যদের ভূমিকা এবং তরুণ সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রগতিও আলোচনায় উঠে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আইপিইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অতীতের নিপীড়ন, গুম, হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছে। তার দাবি, এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা হচ্ছে—এ বিষয়েও আইপিইউ প্রতিনিধিদের অবহিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রনেতারাও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
এ সময় গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত দুটি বিল নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, বিল দুটি সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের সেগুলো পর্যালোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী অধিবেশনে বিল দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
চিফ হুইপ বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসনের সুযোগ রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো পক্ষকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করেই জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ও মোছা. তাহসিনা রুশদী উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








