ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, চোট ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় দলে উত্তরণের বাধা দূর করতে পুনর্গঠন হচ্ছে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) প্রোগ্রাম।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) প্রোগ্রাম নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এ কর্মসূচির মাধ্যমে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা আনা, চোট থেকে পুনরুদ্ধার এবং বয়সভিত্তিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে জাতীয় দলে সফলভাবে উত্তরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্রিকেটে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি ও জাতীয় দলের জন্য সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে এইচপি প্রোগ্রাম। তবে প্রতিভার বিকাশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য নিশ্চিত করতে বিদ্যমান কাঠামোয় পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বোর্ড।
নতুন পরিকল্পনায় জাতীয় দলের বাইরে থাকা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার অপেক্ষায় থাকা ক্রিকেটারদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি করা হবে। খারাপ ফর্ম, ইনজুরি কিংবা অন্য কারণে দল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়রা যাতে নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে আবার প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে কাজ করবে এইচপি ইউনিট।
বিসিবির সহকারী মহাব্যবস্থাপক রবীদ ইমাম জানিয়েছেন, ক্রিকেটারদের সারা বছর খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত রাখাই এ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, প্রতিটি সিরিজ শেষে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে তাঁদের শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হবে। এরপর এইচপি প্রোগ্রামের আওতায় নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন ক্রিকেটাররা।
উচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটারদের চাহিদা অনুযায়ী কোচিং ও সহায়ক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছে বিসিবি। এ জন্য পর্যায়ক্রমে বিশেষজ্ঞ কোচ ও প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মী যুক্ত করা হচ্ছে।
জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে এইচপি দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র এইচপি কোচ হিসেবে কাজ করছেন সোহেল ইসলাম। কোচিং স্টাফে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক বাঁহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক। পেস বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কোরি কলিমোর।
২০০৪ সালে বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির অধীনে এইচপি প্রোগ্রামের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন আরাফাত রহমান কোকো এবং প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রিচার্ড ম্যাকিনেস।
তাঁর অধীনে তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এ কর্মসূচি। পরবর্তী সময়ে তাঁরা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অবদান রাখেন।
তবে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ভালো করার পর জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার মতো সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এসব ঘাটতি কমিয়ে আনতে চায় বিসিবি।
রবীদ ইমামের মতে, খেলোয়াড়দের সঠিক পথে রেখে এমনভাবে প্রস্তুত করা হবে, যাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা তাঁদের জন্য তুলনামূলক সহজ হয়।
২০২৬ সালের এইচপি কর্মসূচিতে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে একাধিক সংস্করণের সিরিজ, বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর এবং অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশের ভিন্ন পরিবেশ, অপরিচিত প্রতিপক্ষ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের অভিজ্ঞতা তরুণ ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করছে বোর্ড।
এ ছাড়া এইচপি দলের জন্য আরও দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের লক্ষ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষ হলে কর্মসূচির জন্য পূর্ণাঙ্গ সূচি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
নারী ক্রিকেটারদের উন্নয়নের জন্য পৃথক এইচপি ইউনিট গঠনের উদ্যোগও নিয়েছে বিসিবি। এর ফলে নারী ক্রিকেটে প্রতিভা অন্বেষণ ও উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়বে।
নতুন এইচপি কাঠামোয় ক্রিকেটারদের ফিটনেস, চোট প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে পেস বোলারদের শারীরিক চাপ সামলানো ও দীর্ঘমেয়াদে ফিট রাখার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
চোটের কারণে বাংলাদেশের অনেক পেসারের ক্যারিয়ার ও নিয়মিত খেলার সুযোগ ব্যাহত হয়েছে। এ সমস্যা কমাতে চিকিৎসা মূল্যায়ন, ফিজিওথেরাপি, শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুশীলন, কাজের চাপ পর্যবেক্ষণ এবং ধাপে ধাপে বোলিংয়ে ফেরার প্রক্রিয়াকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে এইচপি প্রোগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেট একাডেমিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে বিসিবির। এর মাধ্যমে প্রতিভা বিকাশ, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, ফিটনেস, পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রস্তুতিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।
বিসিবির প্রত্যাশা, নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে জাতীয় দলের জন্য মানসম্পন্ন ক্রিকেটার তৈরি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো সহজ হবে।
খেলাধুলা ডেস্ক 

















