হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্রের মাইনে আঘাত পেয়ে চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লাগার দাবি করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। বৃহস্পতিবার দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও দেশটির সেনাবাহিনী এ তথ্য জানায়। এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় অনুমোদনহীন দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় তিনটি তেলবাহী জাহাজ সমুদ্রের মাইনে আঘাত পায়। এতে জাহাজগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার ইরানের সেনাবাহিনী আরও একটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লাগার খবর জানায়। তাদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালীর পূর্ব দিকে নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলের সময় জাহাজটি মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, প্রথম তিনটি জাহাজ তাদের রাডার ও নৌ-চলাচলসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বন্ধ রেখেছিল। পাশাপাশি ইরানের নৌবাহিনীর সতর্কবার্তাও তারা উপেক্ষা করে। তবে এসব ঘটনা কখন ঘটেছে এবং জাহাজগুলোর জাতীয়তা কী, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জানায়, ওমানের খাসাব উপকূল থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বা ৪৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হরমুজ প্রণালীতে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর পেয়েছে তারা।
এর আগে একই এলাকায় আরও দুটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনার তথ্য জানিয়েছিল সংস্থাটি। এর মধ্যে একটি ছোট পালতোলা নৌযানে আগুন ধরে সেটি ডুবে যায়। অন্য ঘটনায় হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের সময় একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মাইন অপসারণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীতে একাধিক জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করেছে ইরান। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের প্রধান জাহাজ চলাচলের পথগুলো থেকে সব মাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইআরজিসি। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বক্তব্যে বাহিনীটির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, শুধু বিবৃতি প্রকাশ করে নয়, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
আইআরজিসির দাবি, হরমুজ প্রণালীর অনুমোদনহীন নৌপথগুলোতে এখনো মাইন পেতে রাখা রয়েছে। এসব এলাকায় চলাচলের ঝুঁকির দায় সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক ও নাবিকদের নিতে হবে। একই সঙ্গে সেন্টকমের বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলেও মন্তব্য করেছে বাহিনীটি।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করেছে ইরান। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ইরানের পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রমও চালাচ্ছে।
রোববার সেন্টকম দাবি করে, গ্রীষ্মকাল থেকে তাদের সহায়তায় উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে।
এদিকে ইরান ওমানের উপকূলঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অনুমোদনহীন হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন আটকের দাবিও ইরানের
হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে একটি মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন আটক করার দাবিও করেছে আইআরজিসি।
বাহিনীটির পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রণালীর পশ্চিমাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে তাদের নৌবাহিনীর ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউএম-১৭০ ড্রোনটি আটক করেছে।
তবে ড্রোন আটকের এ দাবি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালীতে ধারাবাহিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনা, মাইন অপসারণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং ড্রোন আটকের দাবির মধ্য দিয়ে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 






















