রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি দেশটির নারীদের জন্য আরেকটি সংকট হয়ে উঠেছে পারিবারিক সহিংসতা ও দারিদ্র্য। যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো অনেক মা ও শিশু এখন কিয়েভের একটি গোপন আশ্রয়কেন্দ্রে নতুন করে নিরাপদ জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন।
পরিচয় গোপন রাখতে ওলেনা নামটি ব্যবহার করা এক নারী বর্তমানে ছোট ছেলেকে নিয়ে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছেন। যুদ্ধ শুরুর পর কর্মসংস্থান হারিয়ে তিনি ইউরোপের একটি দেশে চলে যান। সেখানে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ও বিয়ের পর তিনি স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে শরীরে আঘাতের চিহ্ন লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হন তিনি।
শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সন্তানকে নিজের কাছে রাখার আইনি অধিকার পাওয়ার চেষ্টা করছেন ওলেনা। তার ভাষায়, যুদ্ধ চললেও নির্যাতনকারী স্বামীর ওপর নির্ভর করার চেয়ে এখন তিনি অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রটি শুধু পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য নয়। ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত পূর্বাঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা মা ও শিশুদেরও এখানে জায়গা দেওয়া হয়। ২০২২ সাল থেকে প্রায় দেড় শতাধিক নারী ও শিশু এই কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছেন। তবে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ছয়জন থাকতে পারায় অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যাও অনেক।
কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা নাতালিয়া লিয়েশুকোভা জানান, বিপদে থাকা নারীদের সহায়তা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহযোগিতায় ইউক্রেনীয় একটি জনস্বাস্থ্যভিত্তিক ফাউন্ডেশন কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে।
যুদ্ধের ফলে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় ইউক্রেনে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সন্তান থাকা নারীরা একসঙ্গে দারিদ্র্য, বাসস্থান সংকট, পারিবারিক সহিংসতা ও যুদ্ধজনিত নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক নারী পরিচয়পত্র হারিয়েছেন। যুদ্ধের অভিঘাতে শিশুদের মধ্যে মানসিক সমস্যা, কথা বলার অসুবিধা ও অপুষ্টির মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে। ফলে স্পিচ থেরাপি ও মানসিক সহায়তার প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
ক্রিস্টিনা নামের আরেক নারী যুদ্ধের সম্মুখসারির এলাকা ছেড়ে কিয়েভে এসে কাজ শুরু করেছিলেন। পরে জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। সন্তানের বাবার কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পেয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল কঠিন—সেখানে নিরাপত্তাহীনতা, বসবাসের অনুপযোগী বাড়ি এবং পারিবারিক নানা সমস্যা অপেক্ষা করছিল।
শেষ পর্যন্ত কিয়েভেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বোনের সহযোগিতায় আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা পান। এখন অনাগত কন্যাসন্তানকে ঘিরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
যুদ্ধের ক্ষত সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শিশুদের ক্ষেত্রেও। পাঁচ বছরের দিয়ানা ও চার বছরের বোগদান বাখমুত থেকে তাদের পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে এসেছে। ভয়াবহ একটি ঘটনার পর দুই শিশুই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল বলে জানান আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। কয়েক মাস পর পরিবারটি নতুন জীবনে পা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় তারা জানতে পারে, যুদ্ধে তাদের সেনাসদস্য বাবা নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুধু মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে না, কেড়ে নিচ্ছে নিরাপত্তা, পরিবার ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অনেক নারী ও শিশুর জন্য হয়ে উঠেছে নতুন করে বেঁচে থাকার একটি নিরাপদ জায়গা।
নিউজ ডেস্ক 

















