ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি বছরের আগস্টে গত বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি আয় ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৩৪ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। গত বছরের আগস্টে এ আয় ছিল ১১৮ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ইউরো। তবে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ সময়ে আমদানির মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৩০ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ইউরো। ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ গত বছরের আগস্টের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের ৯২৩ দশমিক ১১ মিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ৮৬৯ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ, আট মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫৪ মিলিয়ন ইউরো।
একই সময়ে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ২ হাজার ৯৫৬ দশমিক ২১ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। ফলে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ হয়েছে।
পাকিস্তানের চেয়ে ৩৪৪ মিলিয়ন ইউরো এগিয়ে বাংলাদেশ
আট মাসের হিসাবে রপ্তানি কমলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৩৪৪ মিলিয়ন ইউরো বেশি।
পাকিস্তানের ডেনিম রপ্তানি আগস্টে ১৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে ৮৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। তবে জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটির রপ্তানি ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ৫২৫ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে পাকিস্তানের অংশ ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা তুরস্কের রপ্তানি পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়েছে। আগস্টে দেশটির ডেনিম রপ্তানি ১৩ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ৫৮ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। আট মাসে রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ, যার মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৩৮ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ইউরো। ইইউর বাজারে তুরস্কের অংশ ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।
এ ছাড়া জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে তিউনিসিয়ার ডেনিম রপ্তানি ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে ২১৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। কম্বোডিয়ার রপ্তানি ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ১৪৪ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউরো এবং মরক্কোর রপ্তানি ১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে ৬৩ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
মিশর ও চীনের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি
প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে মিশর উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আগস্টে দেশটির ডেনিম রপ্তানি ৫৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে ৩০ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে রপ্তানি ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ১৮৮ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এ সময়ে ইইউর বাজারে মিশরের অংশ ছিল ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
চীনের ডেনিম রপ্তানিও বেড়েছে। আট মাসে দেশটির রপ্তানি ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে, যা ইইউর মোট আমদানির ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে রপ্তানি করলেও ভিয়েতনাম ও ভারত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ভিয়েতনামের ডেনিম রপ্তানি ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ৫৩ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। একই সময়ে ভারতের রপ্তানি ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষতা ও সরবরাহব্যবস্থায় এগিয়ে বাংলাদেশ
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাসসকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানিতে সামগ্রিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলেও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় রয়েছে।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ডেনিম উৎপাদনে একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে। এর ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের সরবরাহব্যবস্থা বহু বছরের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে। উৎপাদন প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্ষমতা অর্জনের ফলে দেশের ডেনিম খাত আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারছে।
তবে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় বাড়াতে শুধু বেশি পরিমাণে পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি, স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে তুলা উৎপাদন সীমিত হলেও কাপড় তৈরি ও পোশাক উৎপাদনে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি রয়েছে। এই সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উন্নত মানের ডেনিম উৎপাদন এবং পণ্যের মূল্য বাড়ানোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ইউরোপের নতুন বাণিজ্যনীতির জন্য প্রস্তুতির তাগিদ
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ইউরোপের পোশাক বাজারে মন্দার পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের ভূমিকা রয়েছে। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশকেও প্রভাবিত করছে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতি, জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি)-এর শর্ত এবং ইউরোপিয়ান গ্রিন ডিলের আওতায় পরিবেশগত বিধিবিধানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক ডেনিম বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, উদ্ভাবন এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি নিয়ে আরও খবর ও তৈরি পোশাকশিল্পের হালনাগাদ তথ্য জানতে ভিজিট করুন তথ্যপ্রকাশ ডটকম।
নিউজ ডেস্ক 


















