বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে প্রায় ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরঞ্জাম ও উপকরণের বাজার তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গৃহস্থালি পর্যায়ে প্রযুক্তিটির বিস্তৃত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রায় ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব বলে জানিয়েছে ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্ল্যাটফর্ম (ডিআরইপি)।
ডিআরইপির হিসাব অনুযায়ী, মাঝারি মাত্রায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটলে বছরে প্রায় ৩৪ হাজার ৫১৮ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করা যেতে পারে।
আবাসিক খাতকে এই সম্ভাবনার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫১ দশমিক ৯৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। দেশে থাকা প্রায় ৪ কোটি ৩ লাখ পরিবারের মধ্যে ৩ কোটি ৫৬ লাখ পরিবার নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করে। ফলে এসব বাড়ির ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করার বড় সুযোগ রয়েছে।
১০ শতাংশ পরিবারে সোলার স্থাপনে ৮,৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা
ডিআরইপির একটি সম্ভাব্য চিত্র অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার যদি ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন সম্ভব।
এ পরিমাণ সক্ষমতা থেকে বছরে আনুমানিক ১৩ হাজার ৯৩৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, যা বর্তমান জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদীর মতে, আরও বিস্তৃতভাবে প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে দেওয়া গেলে ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
কমবে জ্বালানি আমদানি ও কার্বন নিঃসরণ
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে না, একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও কমাতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বছরে জাতীয় কোষাগারের প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া প্রতি মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ হাজার ১০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের ব্যবহারও কমানো সম্ভব হবে।
বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে সাধারণত ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি খরচ হতে পারে।
তৈরি হবে বড় সরঞ্জামের বাজার
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্য সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে দেশে বিভিন্ন ধরনের হার্ডওয়্যার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের বড় বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌর পিভি প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজসহ বিভিন্ন উপকরণ।
ডিআরইপির হিসাবে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা গেলে সরঞ্জাম ও উপকরণের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। এর মধ্যে সৌর প্যানেলের বাজার প্রায় ৬২৮ মিলিয়ন ডলার এবং ইনভার্টারের বাজার প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার হতে পারে।
শুধু সরঞ্জাম নয়, এ খাতের সম্প্রসারণে স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবায়ন এখনও সীমিত
বিশ্বব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৫৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সঙ্গে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট সক্ষমতায় গড়ে ২ দশমিক ৫২টি সবুজ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে।
এই কর্মসংস্থান সক্ষমতার অর্ধেকও যদি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতে কাজে লাগানো যায়, তাহলে প্রায় ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
তবে সম্ভাবনার তুলনায় বর্তমানে দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখনও সীমিত। সিপিডির গবেষণা সহযোগী মো. মেহেদী হাসান শামীম জানান, নেট মিটারিংয়ের আওতায় বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রায় ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবস্থা ঢাকা বিভাগে স্থাপিত হয়েছে।
সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করেছে।
উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় বড় বাধা
সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তুলনামূলক বেশি হলেও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। ক্লিনের এক জরিপে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে ৮৭ শতাংশ মানুষের ধারণা থাকলেও মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ মনে করেন এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। আবার ২৮ শতাংশ মানুষ সৌর প্যানেলের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান।
অ্যাকশনএইডের ব্যবস্থাপক আবুল আজাদের মতে, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, পরিবারের অনিয়মিত আয় এবং সহজ ঋণ সুবিধা সম্পর্কে সীমিত ধারণা প্রযুক্তিটির প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া ঋণ পাওয়ার জটিলতা, আমদানিকৃত সরঞ্জামের ওপর উচ্চ অগ্রিম আয়কর, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পরিদর্শনে সময়ক্ষেপণ এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগ পেতে বিলম্বও খাতটির সম্প্রসারণকে ধীর করছে।
সহজ নেট মিটারিং ও ঋণ সুবিধার সুপারিশ
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নেট মিটারিংয়ের যোগ্যতার শর্ত সহজ করার পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার সুপারিশ করেছে সিপিডি। এ জন্য সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল আবেদন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষ ঋণ সুবিধা, আংশিক ঋণ নিশ্চয়তা এবং ‘পে-অ্যাজ-ইউ-সেভ’ পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার খরচ পরিশোধের সুযোগ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের মূলধনি ব্যয় কমাতে পিভি প্যানেল ও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম শূন্য শুল্কের আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে।
একই সঙ্গে কম উৎপাদনশীল বা অকার্যকর সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা শনাক্ত করে পুনরুদ্ধারের জন্য জাতীয় পর্যায়ে পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমকে হাইব্রিড ও গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হলে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের আস্থাও বাড়ানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, নীতিগত সহায়তা, সহজ অর্থায়ন, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং দ্রুত গ্রিড সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








