ঢাকা ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ঠাকুরগাঁওয়ে ঐতিহাসিক আমগাছ ও সমতলের চা বাগান পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকের মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ২ বিলিয়ন ডলারের বাজারের সম্ভাবনা গণতন্ত্র পুনর্গঠনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস আইপিইউ মহাসচিবের সীমান্ত হত্যা ও চোরাচালান বন্ধে বিজিবিকে আরও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির মতভেদ থাকলেও আলোচনার পথ খোলা, সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে ঐকমত্যের আহ্বান দেশে বর্তমান ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা: হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল হাইকোর্টে স্পিকারের সঙ্গে আইপিইউ মহাসচিবের সাক্ষাৎ, গণতন্ত্র ও সংসদীয় কূটনীতি নিয়ে আলোচনা এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) নবম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়সূচি প্রকাশ
মেসির বিদায়

আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকের মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়

একটি যুগের অবসান হলো বিশ্ব ফুটবলে। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সে ৩১ আগস্ট ২০২৬ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি জানান, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর মাঠে নামবেন না। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো দেশটির হয়ে তার দুই দশকেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল পথচলা।

তবে মেসির এই সিদ্ধান্তকে ক্লাব ফুটবল থেকে অবসর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ালেও ক্লাব পর্যায়ে তার ক্যারিয়ার অব্যাহত রয়েছে।

শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালে

মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৫ সালে। বয়স কম থাকলেও দ্রুতই তিনি জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে নামেন তিনি। সেই বিশ্বকাপ থেকেই শুরু হয় মেসির দীর্ঘ বিশ্বকাপযাত্রা।

পরবর্তী দুই দশকে জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ এবং করেছেন ১২৫ গোল—দুটিই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অসাধারণ পরিসংখ্যান। অবসরের সময় তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে বিদায় নেন।

ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং হতাশার বছর

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম দিকটি ছিল সাফল্যের চেয়ে হতাশায় বেশি ভরা। ২০০৭ কোপা আমেরিকা, ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের যন্ত্রণা তাকে বহন করতে হয়েছে।

বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয় এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালে পরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনায় তীব্র সমালোচনা হয়।

২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর একপর্যায়ে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। দেশের মানুষের ভালোবাসা, সতীর্থদের অনুরোধ এবং নিজের অসমাপ্ত স্বপ্ন তাকে আবার ফিরিয়ে আনে।

২০২১ সালে বদলে গেল গল্প

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ২০২১ সালে। কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা শিরোপা জেতে। এটি ছিল সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি।

এই শিরোপা শুধু একটি ট্রফি ছিল না; এটি মেসিকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে চলা সমালোচনারও বড় জবাব হয়ে আসে।

এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির ক্যারিয়ার পায় পূর্ণতা। আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। মেসি টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে গোল্ডেন বল জেতেন এবং বিশ্বকাপ হাতে তুলে নেন। তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুইবার গোল্ডেন বল জেতা প্রথম খেলোয়াড়ও হন।

২০২৪ কোপা আমেরিকায় আরেকটি শিরোপা

বিশ্বকাপ জয়ের পর থামেননি মেসি। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনাকে আবারও চ্যাম্পিয়ন হতে নেতৃত্ব দেন তিনি। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মেসির আন্তর্জাতিক ট্রফির তালিকায় যোগ হয় কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ—যা তার ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপ: শেষ মঞ্চেও উজ্জ্বল মেসি

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ বড় অধ্যায় ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি দলের আক্রমণের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিলেন।

এই বিশ্বকাপে মেসি আটটি গোল করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১। ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালীন তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন।

বিশ্বকাপে টানা নয়টি ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন মেসি। এই তালিকায় তিনি এককভাবে শীর্ষে, যেখানে ব্রাজিলের জাইরজিনহো ও ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইনের মতো কিংবদন্তিরা ছয়টি করে ম্যাচে গোল করেছিলেন।

আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে যায়। কিন্তু নিউইয়র্ক-নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ হয়। সেই ম্যাচটিই হয়ে ওঠে জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ।

কেন বিদায় নিলেন মেসি?

বিশ্বকাপ ফাইনালের পরপরই তিনি অবসর ঘোষণা করেননি। মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি নিতে তাকে অনেক ভাবতে হয়েছে। তিনি মূলত মনে করেছেন, জাতীয় দলে নিজের দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।

তার বিদায়বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি স্পষ্ট করেছেন যে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রতি তার ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না।

তার অবসরের ঘোষণাটি আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর। মেসি জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পরই বিদায়বার্তা লিখেছিলেন; পরে বাবার মৃত্যুর পর সেই বার্তা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

মেসির আন্তর্জাতিক অর্জন

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হলো—

  • আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ২০৭টি
  • আন্তর্জাতিক গোল: ১২৫টি
  • বিশ্বকাপ: ২০২২ চ্যাম্পিয়ন
  • বিশ্বকাপ ফাইনাল: ২০১৪ ও ২০২৬
  • কোপা আমেরিকা: ২০২১ ও ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন
  • বিশ্বকাপ গোল: ২১টি
  • ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল: ৮টি
  • বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল: ২০১৪ ও ২০২২
  • বিশ্বকাপে গোল করা টানা ম্যাচ: ৯টি—রেকর্ড
  • আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা: ১২৫ গোল

শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মেসিকে বিচার করা যাবে না

মেসির উত্তরাধিকার কেবল গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আবেগ, প্রত্যাশা, ব্যর্থতা এবং প্রত্যাবর্তনের এক দীর্ঘ গল্প।

একসময় যে মেসিকে জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি জেতাতে না পারার কারণে সমালোচিত হতে হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ এবং আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন।

২০১৬ সালের হতাশা থেকে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়—এই যাত্রাই সম্ভবত তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গল্প।

একটি প্রজন্মের শেষ

মেসির বিদায়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক প্রজন্মেরও সমাপ্তি ঘটল। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শুধু শিরোপা জেতেনি, বরং একটি নতুন ফুটবল-সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে মেসি হয়ে উঠেছেন নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা ও কঠিন সময় পেরিয়ে ফিরে আসার প্রতীক।

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে বিদায় নেওয়ায় হয়তো শেষ দৃশ্যটি রূপকথার মতো হয়নি। কিন্তু তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে বিবেচনা করলে গল্পটির শেষ অধ্যায় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।

দুই দশকের বেশি সময়, ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ এবং অসংখ্য রেকর্ড—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ হলো।

মেসি হয়তো আর আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন না। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তার ১০ নম্বর জার্সি, বিশ্বকাপ হাতে তার সেই ছবি এবং কোটি মানুষের আবেগ—এসব থেকে তার গল্পের বিদায় নেওয়ার সুযোগ নেই।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Editorial Desk

ঠাকুরগাঁওয়ে ঐতিহাসিক আমগাছ ও সমতলের চা বাগান পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত

মেসির বিদায়

আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকের মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়

Update Time : ০৫:৩২:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি যুগের অবসান হলো বিশ্ব ফুটবলে। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সে ৩১ আগস্ট ২০২৬ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি জানান, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর মাঠে নামবেন না। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো দেশটির হয়ে তার দুই দশকেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল পথচলা।

তবে মেসির এই সিদ্ধান্তকে ক্লাব ফুটবল থেকে অবসর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ালেও ক্লাব পর্যায়ে তার ক্যারিয়ার অব্যাহত রয়েছে।

শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালে

মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৫ সালে। বয়স কম থাকলেও দ্রুতই তিনি জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে নামেন তিনি। সেই বিশ্বকাপ থেকেই শুরু হয় মেসির দীর্ঘ বিশ্বকাপযাত্রা।

পরবর্তী দুই দশকে জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ এবং করেছেন ১২৫ গোল—দুটিই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অসাধারণ পরিসংখ্যান। অবসরের সময় তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে বিদায় নেন।

ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং হতাশার বছর

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম দিকটি ছিল সাফল্যের চেয়ে হতাশায় বেশি ভরা। ২০০৭ কোপা আমেরিকা, ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের যন্ত্রণা তাকে বহন করতে হয়েছে।

বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয় এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালে পরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনায় তীব্র সমালোচনা হয়।

২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর একপর্যায়ে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। দেশের মানুষের ভালোবাসা, সতীর্থদের অনুরোধ এবং নিজের অসমাপ্ত স্বপ্ন তাকে আবার ফিরিয়ে আনে।

২০২১ সালে বদলে গেল গল্প

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ২০২১ সালে। কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা শিরোপা জেতে। এটি ছিল সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি।

এই শিরোপা শুধু একটি ট্রফি ছিল না; এটি মেসিকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে চলা সমালোচনারও বড় জবাব হয়ে আসে।

এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির ক্যারিয়ার পায় পূর্ণতা। আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। মেসি টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে গোল্ডেন বল জেতেন এবং বিশ্বকাপ হাতে তুলে নেন। তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুইবার গোল্ডেন বল জেতা প্রথম খেলোয়াড়ও হন।

২০২৪ কোপা আমেরিকায় আরেকটি শিরোপা

বিশ্বকাপ জয়ের পর থামেননি মেসি। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনাকে আবারও চ্যাম্পিয়ন হতে নেতৃত্ব দেন তিনি। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মেসির আন্তর্জাতিক ট্রফির তালিকায় যোগ হয় কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ—যা তার ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপ: শেষ মঞ্চেও উজ্জ্বল মেসি

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ বড় অধ্যায় ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি দলের আক্রমণের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিলেন।

এই বিশ্বকাপে মেসি আটটি গোল করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১। ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালীন তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন।

বিশ্বকাপে টানা নয়টি ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন মেসি। এই তালিকায় তিনি এককভাবে শীর্ষে, যেখানে ব্রাজিলের জাইরজিনহো ও ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইনের মতো কিংবদন্তিরা ছয়টি করে ম্যাচে গোল করেছিলেন।

আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে যায়। কিন্তু নিউইয়র্ক-নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ হয়। সেই ম্যাচটিই হয়ে ওঠে জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ।

কেন বিদায় নিলেন মেসি?

বিশ্বকাপ ফাইনালের পরপরই তিনি অবসর ঘোষণা করেননি। মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি নিতে তাকে অনেক ভাবতে হয়েছে। তিনি মূলত মনে করেছেন, জাতীয় দলে নিজের দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।

তার বিদায়বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি স্পষ্ট করেছেন যে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রতি তার ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না।

তার অবসরের ঘোষণাটি আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর। মেসি জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পরই বিদায়বার্তা লিখেছিলেন; পরে বাবার মৃত্যুর পর সেই বার্তা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

মেসির আন্তর্জাতিক অর্জন

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হলো—

  • আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ২০৭টি
  • আন্তর্জাতিক গোল: ১২৫টি
  • বিশ্বকাপ: ২০২২ চ্যাম্পিয়ন
  • বিশ্বকাপ ফাইনাল: ২০১৪ ও ২০২৬
  • কোপা আমেরিকা: ২০২১ ও ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন
  • বিশ্বকাপ গোল: ২১টি
  • ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল: ৮টি
  • বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল: ২০১৪ ও ২০২২
  • বিশ্বকাপে গোল করা টানা ম্যাচ: ৯টি—রেকর্ড
  • আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা: ১২৫ গোল

শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মেসিকে বিচার করা যাবে না

মেসির উত্তরাধিকার কেবল গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আবেগ, প্রত্যাশা, ব্যর্থতা এবং প্রত্যাবর্তনের এক দীর্ঘ গল্প।

একসময় যে মেসিকে জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি জেতাতে না পারার কারণে সমালোচিত হতে হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ এবং আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন।

২০১৬ সালের হতাশা থেকে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়—এই যাত্রাই সম্ভবত তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গল্প।

একটি প্রজন্মের শেষ

মেসির বিদায়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক প্রজন্মেরও সমাপ্তি ঘটল। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শুধু শিরোপা জেতেনি, বরং একটি নতুন ফুটবল-সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে মেসি হয়ে উঠেছেন নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা ও কঠিন সময় পেরিয়ে ফিরে আসার প্রতীক।

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে বিদায় নেওয়ায় হয়তো শেষ দৃশ্যটি রূপকথার মতো হয়নি। কিন্তু তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে বিবেচনা করলে গল্পটির শেষ অধ্যায় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।

দুই দশকের বেশি সময়, ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ এবং অসংখ্য রেকর্ড—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ হলো।

মেসি হয়তো আর আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন না। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তার ১০ নম্বর জার্সি, বিশ্বকাপ হাতে তার সেই ছবি এবং কোটি মানুষের আবেগ—এসব থেকে তার গল্পের বিদায় নেওয়ার সুযোগ নেই।