জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষাকে আগামীর বাংলাদেশের প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
রোববার সকালে সাভার সেনানিবাসে কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা কেবল অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলের ওপর নির্ভর করে না। শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ, জনগণের আস্থা এবং চেইন অব কমান্ডের প্রতি আনুগত্যই একটি বাহিনীর প্রকৃত শক্তির ভিত্তি।
তিনি বলেন, কোনো ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করা তার পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতি। এই সম্মাননা সংশ্লিষ্ট ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক।
জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষাকে প্রতিটি সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, এই পতাকা অর্জন মানে অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পালনের নতুন অঙ্গীকার।
বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক অবদানের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হলেও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদান স্মরণ রাখা প্রয়োজন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ঘোষণা এবং পরবর্তী সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে জিয়াউর রহমান ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) ও সৈনিকদের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন ইউনিটের বাঙালি সেনাসদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে একজন সেনা কর্মকর্তার ঐতিহাসিক ভূমিকা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গৌরব ও অনুপ্রেরণার উৎস। এ কারণেই সেনাবাহিনীর সাফল্যকে দেশের সাফল্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন দেশপ্রেমিক নাগরিকেরা।
বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, যুদ্ধের ধরন ও কৌশল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আধুনিকায়নের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তবে প্রযুক্তি কখনো মানুষের বিকল্প হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে তিন বাহিনী যেন সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সে লক্ষ্যে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সীমানা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন সংকটে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দায়িত্ব পালনের প্রতিটি পর্যায়ে সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সংবিধান, প্রচলিত আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সশস্ত্র বাহিনীর বেতন-ভাতা ও কল্যাণে গুরুত্ব
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ছয়টি ইউনিট পেল ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড
অনুষ্ঠানে পেশাগত সাফল্য ও দায়িত্ব পালনে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ছয়টি ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করা হয়। ইউনিটগুলো হলো—৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান, কূটনৈতিক কোরের প্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদন | বাংলাদেশের রাজনীতির সর্বশেষ খবর | জাতীয় সংবাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক | তথ্য প্রকাশ 






















