ভৌগোলিক নৈকট্যকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমানো, স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সিআইআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থান পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত অর্থনীতির আকার বড় হলেও দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম। অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে আগের স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে আলোচনা প্রয়োজন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। নিয়মিত যাতায়াতকারীদের বারবার নতুন করে ভিসার আবেদন করার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা সুবিধা চালুর বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এদিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই। একটি টাস্কফোর্স অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) নিয়ে কাজ করবে। অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডাটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করবে।
সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, ভারতে অবকাঠামো খাতে বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে।
বৈঠকে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা সমস্যায় অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও কমানো সম্ভব।
এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিনিধিদলের এক সদস্য বলেন, দেশে উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনতে দীর্ঘ সময় লাগায় প্রকল্প বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়ে। স্থানীয় শিল্প শক্তিশালী করা গেলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এফএমসিজি খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, হোম কেয়ার ইনসেক্টিসাইড, ফ্র্যাগরেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বানও জানানো হয়েছে। সিআইআই প্রতিনিধিদের দাবি, তাদের স্টিম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে শুল্ক বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা কমাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।
বৈঠকে উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, ব্যবসায়ী পর্যায়ের যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















