অধিকৃত পশ্চিম তীরের তিনটি শরণার্থী শিবির থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর এ উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে প্রতিবেদনটির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে ইসরাইল ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। অভিযানের সময় জেনিন, তুলকারেম ও নূর শামস শরণার্থী শিবির থেকে ৩৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযান চলাকালে ইসরাইলি সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী শিবিরগুলোতে প্রবেশ করে। এ সময় প্রাণহানি, ব্যাপকভাবে বাড়িঘর ধ্বংস এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
শিবিরগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সীমিত করারও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে নিরাপত্তা বাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ওই তিন শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৩ হাজার ৩৬২ জন ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
‘জোরপূর্বক স্থানান্তরের’ গুরুতর আশঙ্কা
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর বলেছে, বিমান হামলা, ভারী বুলডোজার ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে শিবিরগুলোর বড় অংশ বসবাসের অনুপযোগী করে তোলা, বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর উদ্বেগের।
দপ্তরটির মতে, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ ‘জোরপূর্বক স্থানান্তর’-এর আওতায় পড়তে পারে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপ সমষ্টিগত শাস্তির রূপ নিতে পারে এবং পশ্চিম তীরে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত উচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান ইসরাইলের
তবে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল। জেনেভায় দেশটির মিশনের অভিযোগ, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতার নীতি থেকে সরে গিয়ে ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
ইসরাইলের দাবি, প্রতিবেদনে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি এবং এতে ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করা হয়েছে।
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইলের দখলে থাকা পশ্চিম তীরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলার পর থেকেই সহিংসতা বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ইসরাইল ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’ শুরু করে। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মাত্র দুই দিন পর পশ্চিম তীরে এ অভিযান শুরু হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল জানায়, তারা জেনিন, তুলকারেম ও নূর শামস—এই তিন শরণার্থী শিবির খালি করেছে। পশ্চিম তীরের মোট ১৯টি শরণার্থী শিবিরের মধ্যে এই তিনটি অন্যতম।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ সে সময় সেনাদের এসব এলাকায় দীর্ঘ সময় অবস্থানের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বাসিন্দাদের ফিরে আসা ঠেকানো এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান প্রতিরোধের কথাও বলা হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক শুক্রবার বলেন, সামরিক অভিযান যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সেখানে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যও থাকতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















