যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ ও চাপের মধ্যেই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিতে দুই দিনের সফরে যাচ্ছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন। গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন আরও স্পষ্ট করাই এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
রোববার শুরু হওয়া সফরের দ্বিতীয় দিনে ইইউ ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণা সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
রয়্যাল ড্যানিশ ডিফেন্স কলেজের গবেষক মার্ক ইয়াকবসেনের মতে, আর্কটিক অঞ্চলে প্রবেশের কৌশলগত অবস্থান, বিপুল খনিজ সম্পদ এবং নিরাপত্তাগত গুরুত্বের কারণে গ্রিনল্যান্ড ইউরোপের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের আগ্রহে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
চলতি বছরের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে অঞ্চলটি দখলের সম্ভাবনা নাকচ করেন।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশে অবস্থান নেয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও ইইউ নতুন করে গুরুত্ব দেয়।
জানুয়ারিতে ভন ডার লেয়েন গ্রিনল্যান্ডে বড় ধরনের ইউরোপীয় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। গ্রিনল্যান্ড ইইউর সদস্য না হলেও ডেনমার্কের সদস্যপদ থাকায় অঞ্চলটির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের জন্য বাড়ছে ইউরোপীয় অর্থায়ন
২০২৮ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত ইইউর পরবর্তী বাজেট কাঠামোয় গ্রিনল্যান্ডের জন্য সরাসরি সহায়তা দ্বিগুণ করে ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তাব দিয়েছে ব্রাসেলস।
এ ছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, ভন ডার লেয়েনের এবারের সফরে গ্রিনল্যান্ডের জন্য আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইউরোর সহায়তার প্রস্তাব আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুধু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতিও জোরদার হতে পারে।
একই সময়ে ন্যাটোর সামরিক মহড়া
ভন ডার লেয়েনের সফরের সময়ই গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে শুরু হচ্ছে ন্যাটোর ‘আর্কটিক শিল্ড’ সামরিক মহড়া। এতে ১০টি দেশের সেনারা অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরাজনীতি গবেষক মিকায়া ব্লুজোঁ-মেরে মনে করেন, ভন ডার লেয়েনের সফর এবং ন্যাটোর মহড়ার সময়কালকে নিছক কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
এর আগে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ডেনমার্কের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোপেনহেগেন ওই অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ন্যাটোও আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের কার্যক্রম জোরদার করেছে।
ইয়াকবসেনের মতে, সামরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ন্যাটোর ভূমিকা ইইউর পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইউরোপ গ্রিনল্যান্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে—‘গ্রিনল্যান্ড একা নয়।’
মার্কিন চাপের মধ্যেও গ্রিনল্যান্ডে বিনিয়োগের চেষ্টা
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মে মাসে ট্রাম্পের বিশেষ দূত জেফ ল্যান্ড্রির গ্রিনল্যান্ড সফরের পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য কিছুটা কম সরব হলেও বিষয়টি ওয়াশিংটনের এজেন্ডায় রয়ে গেছে।
ট্রাম্প মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে একটি ছবি প্রকাশ করেন, যার সঙ্গে ছিল ‘হ্যালো, গ্রিনল্যান্ড!’ বার্তা।
এদিকে আগস্টে গ্রিনল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের একটি দুর্গম এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি তেল কোম্পানির প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশের পর স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেয়েছিল। তবে অনুসন্ধানমূলক খননকাজ শুরুর জন্য এখনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পায়নি।
খনিজ সম্পদে ইউরোপের আগ্রহ
তেল-গ্যাসের পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের বিপুল খনিজ সম্পদও ইউরোপের আগ্রহের অন্যতম কারণ। অঞ্চলটির খনিজ শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হওয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করা হয়।
ইয়াকবসেনের মতে, এ ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ড ও ইইউর স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের খনিজ খাত বিকাশের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও বড় বাজার। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের জন্য নির্ভরযোগ্য ও বৈচিত্র্যময় সরবরাহ উৎস খুঁজছে।
তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো সহজ হচ্ছে না। ৬০টির বেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ১৩৫টি খনন অনুমতিপত্র থাকলেও বর্তমানে সেখানে সক্রিয় খনি রয়েছে মাত্র দুটি।
দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভন ডার লেয়েনের এবারের সফর গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ককে আরও গভীর করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ইইউর শীর্ষ পর্যায়ের এই সফরকে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখছেন তারা।
সফরকালে ভন ডার লেয়েন গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং ডেনমার্কের আরেক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ফারো দ্বীপপুঞ্জের সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর স্বার্থ যখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, তখন ভন ডার লেয়েনের এই সফর আর্কটিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিতে ইউরোপের অবস্থান আরও দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















