বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ঢাকায়। তিন দিনব্যাপী এ আলোচনা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রপ্তানি বাড়ানো এবং পারস্পরিক বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এ আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অংশ নিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমআইটিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামাল হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন। বৈঠকে দুই দেশের প্রস্তাব পর্যালোচনা এবং সম্ভাব্য চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে এফটিএ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে সম্মতি হয়েছে। গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রথম দফার আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ, বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্কসুবিধা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। কোন দেশ অপর দেশকে কী ধরনের বাণিজ্য সুবিধা দিতে পারে, তা-ও পর্যালোচনা করা হবে।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার বাজারে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য, খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লেও আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। মালয়েশিয়ার উপ-হাইকমিশনার মোসাম্মৎ শাহানারা মনিকার দেওয়া তথ্যের বরাতে বারনামা জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় প্রায় ৩০ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২২৬ কোটি মার্কিন ডলার।
এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এফটিএ আলোচনায় বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শুল্কসংক্রান্ত বাধা কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, খাদ্য ও পানীয়, শাকসবজি এবং মসলা। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে প্রধানত খনিজ জ্বালানি, ভোজ্যতেল ও অন্যান্য তেলজাত পণ্য, লোহা-ইস্পাত, প্লাস্টিক, যন্ত্রপাতি এবং রাসায়নিক পণ্য আমদানি করা হয়। <Cite refs={[“turn218441search1″,”turn218441search14”]}/>
এফটিএ থেকে কী সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ?
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট পণ্যের শুল্ক কমানো বা তুলে নেওয়া, বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কী ধরনের পণ্য কতটা শুল্কসুবিধা পাবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির চূড়ান্ত শর্তের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির কারণে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা রয়েছে, যদি এ বিষয়ে সময়সূচি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত না আসে। উত্তরণের পর কিছু আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।
তবে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত হবে না। পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত বিধি, শুল্কছাড়ের আওতা, অশুল্ক বাধা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের বাস্তব সুযোগ বিবেচনায় নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএর প্রথম দফার আলোচনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আলোচনায় কী ধরনের সমঝোতা হয় এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা কতটা সুবিধা পান, তার ওপরই নির্ভর করবে এ উদ্যোগের বাস্তব সুফল।
নিউজ ডেস্ক 




















