আন্তর্জাতিক আর্চারিতে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। ইরাকের সুলাইমানিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় লেগে স্বর্ণসহ একাধিক পদক জিতে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ দল। রিকার্ভ পুরুষ দলীয় ইভেন্টে কাজাখস্তানকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের স্বর্ণপদক অর্জন করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
রোববার ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশে ফেরা আর্চারদের স্বাগত জানান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান। এ সময় বাংলাদেশ আর্চারী ফেডারেশনের সভাপতি কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তানভীর রায়হান এবং যুগ্ম সম্পাদক রুবেল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এবারের প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন বন্যা আক্তার। নারী কম্পাউন্ড ব্যক্তিগত ফাইনালে কাজাখস্তানের মিলানা বুরলেভাকে ১৪৫-১৪৩ পয়েন্টে হারিয়ে শিরোপা জেতেন তিনি। নারী দলীয় ইভেন্টেও স্বর্ণপদক অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে রিকার্ভ পুরুষ দলীয় ইভেন্টে আব্দুর রহমান আলিফ, সাগর ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল মোহাম্মদ রাফি কাজাখস্তানকে ৬-২ সেট পয়েন্টে হারিয়ে স্বর্ণপদক নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছেন কুলসুম আক্তার মনি।
নিজের অর্জন নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বন্যা আক্তার বলেন, ব্যক্তিগত এশিয়া কাপের প্রথম স্বর্ণপদক তার ক্যারিয়ারে বিশেষ অর্জন। এই সাফল্য ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও অলিম্পিকের মতো বড় প্রতিযোগিতায় ভালো করার আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
রিকার্ভ পুরুষ দলের স্বর্ণজয়কে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল হিসেবে দেখছেন সাগর ইসলাম। আগামীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপে এবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রত্যাশা তাদের। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকে বাংলাদেশের হয়ে পদক জয়ের স্বপ্ন দেখছেন আর্চাররা।
তবে পদক জয়ের আনন্দের পাশাপাশি প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত ইভেন্টে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার আক্ষেপও রয়েছে খেলোয়াড়দের। দলীয় ম্যানেজার তাজুল হোসেন বাপ্পী মনে করেন, আর্চারির মতো মনোযোগ ও মানসিক চাপনির্ভর খেলায় সাফল্য পেতে খেলোয়াড়দের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণের মান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রধান কোচ ফ্রেডেরিক মার্টিন জানান, এবারের দলে প্রায় ৮০ শতাংশ ছিলেন তরুণ আর্চার। বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-২১ ও অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বড় প্রতিযোগিতায় ভিন্ন পরিবেশে ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা আগামী ডিসেম্বরে যুব এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে কাজে লাগবে বলে আশাবাদী তিনি।
এদিকে খেলাধুলার উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৩০০ খেলোয়াড়কে মাসিক এক লাখ টাকা করে ক্রীড়া ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় নির্বাচন করে বিকেএসপিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে সরকার।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সূচি অনুযায়ী ফেডারেশনগুলোর বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণ নয়, বরং পদক অর্জনের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা।
এশিয়া কাপের এই অর্জন বাংলাদেশের আর্চারিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। তবে বিশ্বকাপ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও অলিম্পিকের মতো বড় আসরে সাফল্য পেতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। তরুণ আর্চারদের এই সাফল্য ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে—এমন প্রত্যাশাই এখন ক্রীড়াপ্রেমীদের।
আরো পড়ুন:
খেলাধুলা ডেস্ক 












