কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১১১ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে খালি হাত, বালতি ও সাধারণ সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করেছেন স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকর্মীরা। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার কিছু পর দেশটির কফি অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। তীব্র কম্পনে আতঙ্কিত হয়ে হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুইবদোর আইন বিভাগের শিক্ষার্থী উইলমার কুয়েস্তা জানান, কম্পনের সময় মানুষ আতঙ্কে কোনো কিছু নেওয়ার সুযোগ ছাড়াই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। অনেকে ভবনের ওপরের তলা থেকেও লাফিয়ে নিচে নামেন।
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন শহরে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। ক্যালিতে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে শাবল, বালতি ও হাতের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ সরাতে থাকেন। উদ্ধারকারীরা কয়েক মিনিট পরপর কাজ থামিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের কোনো সাড়া পাওয়া যায় কি না, তা শোনার চেষ্টা করেন।
স্বেচ্ছাসেবক আন্দ্রেস ফেলিপে মেহিয়া জানান, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মানুষদের শিস দিতে বলেন। একপর্যায়ে শিসের মাধ্যমে সাড়া পাওয়া গেলে একজন পুরুষ ও একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তবে ওই ব্যক্তির স্ত্রী তখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন।
উদ্ধারকাজে স্থানীয়দের পাশাপাশি দমকলকর্মী ও অন্যান্য জরুরি সেবার সদস্যরা অংশ নেন। অনেক মানুষ খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান।
ভূমিকম্পে বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কংক্রিটের দেয়াল ও মেঝে ধসে পড়েছে, কোথাও ঘরের আসবাব ও কাপড়চোপড় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। সড়কেও ছড়িয়ে পড়েছে বৈদ্যুতিক তার। মানিজালেসে একটি ঐতিহাসিক নব্য-গথিক ক্যাথেড্রালের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুইবদোর দন্ত চিকিৎসক জুলিয়ান পেনা বলেন, তিনি ভূমিকম্পের সময় অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পন অনুভব করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিলেন এবং আতঙ্কে অনেকেই কোনো জিনিসপত্র সঙ্গে না নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।
রাজধানী বোগোতাসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। বোগোতায়ও বহু মানুষ দ্রুত ঘর ছেড়ে রাস্তায় আশ্রয় নেন। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১১০ কিলোমিটার গভীরে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশেষজ্ঞদের মতে, নাজকা টেকটোনিক প্লেটের গভীরে থাকা একটি চ্যুতিরেখায় ভূতাত্ত্বিক নড়াচড়ার ফলে এই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
ভূমিকম্পের পর দেশটির পাঁচটি শহরের হাসপাতালকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়। ক্যালিতে রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ছয়টি স্থানীয় বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পেশাদার ফুটবলের সব আসন্ন ম্যাচও স্থগিত করা হয়েছে।
কলম্বিয়ার পপ তারকা শাকিরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে তিনি দেশবাসীকে একে অপরকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
ভূমিকম্পের ঘটনায় বিভিন্ন দেশ কলম্বিয়ার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কলম্বিয়ার জনগণকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। পরে যুক্তরাষ্ট্র জরুরি ত্রাণ হিসেবে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। ইইউর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য উপগ্রহভিত্তিক কোপার্নিকাস সেবা ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসরাইল, মেক্সিকো, ইকুয়েডর ও ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশ কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
ধসে পড়া ভবনগুলোতে উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির কর্তৃপক্ষ।
নিউজ ডেস্ক 



















