কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে বাড়তে থাকা সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন এআইভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দেশের আর্থিক খাতের পরিবর্তিত প্রযুক্তিগত চাহিদা ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত নীতিমালা তৈরি করা হবে। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো শক্তিশালী করা, সাইবার হামলা শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জটিল প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণ মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিক করার বিষয়ে নির্দেশনা থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হাসান বাসসকে বলেন, শিগগিরই নীতিমালাটি তৈরি করে তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। সেই নির্দেশনা অনুসারে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা হালনাগাদ করবে।
আর্থিক খাতের বর্তমান সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজ করছে।
জাকির হাসান বলেন, সাইবার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে। তবে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কোনো এককালীন কার্যক্রম নয়। এ জন্য সার্বক্ষণিক নজরদারি, সতর্কতা এবং নিয়মিত নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগ বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এ ধরনের কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়নি।
আর্থিক খাতের জন্য অভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদারে গত ২৯ মার্চ ‘সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক, ভার্সন ১.০ (২০২৬)’ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী, পেমেন্ট সার্ভিস প্রদানকারী এবং পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে।
নির্দেশনায় সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সুরক্ষা, সাইবার হুমকি পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাজনিত ঘটনা মোকাবিলা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও আউটসোর্সিং কার্যক্রমের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কাঠামোটিতে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—ঝুঁকি ও দুর্বলতা শনাক্তকরণ, সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হুমকি শনাক্ত করা, সাইবার আক্রমণ মোকাবিলা, স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন তৈরি।
এর মাধ্যমে কোনো সাইবার হামলার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া, আক্রমণের সময় ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা এবং ঘটনার পর দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এআইয়ের প্রসারে বাড়ছে সাইবার অপরাধের নতুন ঝুঁকি
আর্থিক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার ফলে একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তিগত সুবিধা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে।
এআই প্রযুক্তি বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, লেনদেনের অস্বাভাবিক প্রবণতা শনাক্ত এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীরা আরও বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া বার্তা তৈরি, পরিচয় জালিয়াতি, স্বয়ংক্রিয় সাইবার আক্রমণ এবং গ্রাহকদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বাড়ালেই চলবে না; দক্ষ জনবল তৈরি, সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সাইবার আক্রমণ মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারবে।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থায় সাময়িক বন্ধ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনায়। আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছিল।
ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির কয়েকটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে এ সতর্কতা জারি করা হয়। গত ২১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছিল, এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা আক্রান্ত সার্ভারে ক্ষতিকর কোড চালানোর চেষ্টা করতে পারে।
দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ শেষ করার পর গত ২৫ অক্টোবর সকাল ৮টায় ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করা হয়।
ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাসসকে জানিয়েছিলেন, কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হয়নি। ডিজিটাল লেনদেনসহ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাতেও কোনো ঝুঁকি নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনায় সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত না হলেও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবল বাড়ানোর তাগিদ
সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে তাদের ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সাইবার হুমকি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই ব্যাংকগুলোকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে এবং নিয়মিত নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করতে হবে।
তার মতে, শুধু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য দক্ষ জনবল, নিয়মিত কর্মী প্রশিক্ষণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী আরও বলেন, সাইবার নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ব্যাংকগুলোকে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত এবং সন্দেহজনক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ব্যাংকিং সেবার নিরাপত্তা ও গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের আর্থিক খাত ক্রমেই ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন পেমেন্ট এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ফলে এসব সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখার অন্যতম শর্ত।
বড় ধরনের সাইবার হামলার কারণে ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হওয়া, সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে সাইবার হামলা প্রতিরোধের পাশাপাশি আক্রমণ মোকাবিলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কার্যক্রম দ্রুত পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত এআইভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা এবং বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবায়ন দেশের আর্থিক খাতকে নতুন প্রযুক্তিগত ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনার ওপর।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও আস্থাশীল ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















