কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমিতে গ্রিড-সংযুক্ত এ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মাতারবাড়ীর ২×৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে থাকা ১৭১ একর অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, প্রকল্প ঋণ ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামোর আওতায় প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। এ কাঠামোয় ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ এবং ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সহায়তা রয়েছে।
অব্যবহৃত জমিতে হবে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ছাই সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বাকি ৫২৫ একর জমি অব্যবহৃত রয়েছে।
এই অব্যবহৃত জমির একটি অংশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ছাইয়ের পুকুরের চারপাশে বিদ্যমান ১৪ মিটার উঁচু বাঁধ থাকায় নতুন করে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন হবে না।
জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে নতুন বিদ্যুৎ
প্রকল্পের আওতায় সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) মডিউল, ইনভার্টার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে।
পাশাপাশি মাতারবাড়ী ও চকরিয়া উপকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় সার্কিটের সঞ্চালন কন্ডাক্টর স্থাপন এবং চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার বে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
৫০ থেকে ৭০ মেগাওয়াটে উন্নীত
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রথমে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে শিগগিরই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রকল্প ব্যয় নিয়ে কমিশনের পর্যবেক্ষণ
প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয়ে ব্যাখ্যা ও সংশোধনী চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে প্রধান যন্ত্রপাতির প্রস্তাবিত মূল্য যাচাই, অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন গ্রহণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন বাড়ানো।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিপিজিসিবিএল মোট প্রকল্প ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে। এর পরিমাণ প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের গুণগত মান, বাজারমূল্য, যানবাহন ও অফিস সরঞ্জাম কেনার বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও পর্যালোচনা করা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন সম্ভাবনা
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎসের সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৫৪ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) নতুন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও অনুমোদন শেষে প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | তথ্য প্রকাশ 











