বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাব-ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন সালামত উল্লাহ। বদলি পদায়নে তিনি পূর্বাঞ্চলের ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন চৌকি-সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ২০ বছরের কর্মজীবনে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান।
ইন্সপেক্টর পদে থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে তিনি আরও দুটি লোভনীয় পদের দায়িত্বে আছেন। একটি চট্টগ্রাম অস্ত্র শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলের চিফ ইন্সপেক্টর। অন্যটি জ্যেষ্ঠতার অজুহাতে লবিংয়ের মাধ্যমে বাগিয়ে নেওয়া অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্টের মতো দায়িত্বশীল পদ।
একাধিক সূত্র বলছে, চিফ ইন্সপেক্টর থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্টের (অ. দা.) দায়িত্ব পেয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকলেও চেম্বারের বাইরে ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট’-এর নেমপ্লেট লাগিয়ে দিব্যি অফিস করছেন তিনি। ঘুষ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ভুয়া টিএ বিলের কমিশন বাণিজ্য, তদন্ত বাণিজ্য ও সরকারি জায়গা দখল বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে স্থায়ীভাবে পদোন্নতির আগেই দক্ষ হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ।
যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের ক্ষমতা জাহির করতে দ্বিধা করেন না তিনি। সরকারদলীয় লোকজনের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে ছড়িয়ে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরতেও পটু বলে অভিযোগ আছে।
৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে নিজের গ্রামের লোক পরিচয় দিয়ে ক্ষমতা বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর আগে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবিকে পুঁজি করে একইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি ঠেকাতে নিজেকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সাংবাদিকদের নিকটাত্মীয় বলে প্রচার করেছেন বলেও জানা গেছে। তথ্যসূত্র মতে, তাঁর অধীনে কর্মরত আরএনবি সদস্যদের বিরুদ্ধে খবর ছাপিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে সালামতের বিরুদ্ধে ‘সালামি বাণিজ্য’-এর তথ্য মিলেছে। সম্প্রতি মতিয়ার পুলের দরবার ট্রেডিং নামের একটি ভাঙারি দোকানে রেলের চোরাই লোহা পাওয়ার অভিযোগে আজগর নামের একজনকে ধরে এনে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
কদমতলী পোস্তারপাড় এলাকার বিভিন্ন বস্তিঘর, অবৈধ স্থাপনা ও ছাগলের বাজার থেকে মাসে ১৩ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ আছে। কদমতলীর ফোর স্টার সিএনজি পাম্পের বিপরীতে রেলের কোয়ার্টারের সীমানার ভেতরে ফলের ক্যারেট রাখার জন্য মাসে ৪ হাজার টাকা এবং ফলমন্ডি এলাকায় রেলের কোয়ার্টার বাণিজ্যিকীকরণের জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও পাওয়া যায়। পলোগ্রাউন্ড ব্রিজের নিচে ফলের ক্যারেট রাখা বাবদ মাসে ৫ হাজার টাকা আদায় করে তাঁর লোকজন।
হাটহাজারীর জানআলীর হাট রেললাইন-সংলগ্ন এলাকার অবৈধ দোকানপাট ও বস্তিঘর থেকে কপিল ও সুজন নামের দুজনকে দিয়ে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ আছে। কালুরঘাট এলাকায় রেলের বেদখল স্থাপনা থেকেও মাসোহারা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে উচ্ছেদ না করায় অবৈধ দখলদারদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন সালামত, এমন অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নগরীর আকবর শাহ এলাকার নিউ শহীদ লেনে রেলের প্রায় ১৫-২০টি কোয়ার্টারের অবৈধ বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নোটিশ দেখিয়ে সাব-ইন্সপেক্টর মো. জসীমের মাধ্যমে সমঝোতা করার তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমে।
একই নিয়মে গোয়ালপাড়া তুলাতুলি এলাকার অবৈধ দখলদার দুলালের সঙ্গেও মাসিক ভিত্তিতে মাসোহারা নির্ধারণ করেন সালামতের আস্থাভাজন এসআই জসিম বলে অভিযোগ। এ ছাড়া প্রতিটি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সময় আইওডব্লিউ অফিসার ও ভূমি আইনে মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।
আস্থাভাজন ‘ক্যাশিয়ার’ খ্যাত সিপাহি মাহমুদুল হাসানকে দিয়ে সিআরবির প্রতিটি ভাসমান দোকান থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও আছে। রেলওয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের বাড়ি মাহমুদুলের নিজ এলাকা সন্দ্বীপে হওয়ায় তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করে রেলাঙ্গনে বেপরোয়া আচরণের অভিযোগও মিলেছে। এসব বিষয়ে সিপাহি মাহমুদুল হাসানের ব্যবহৃত ০১৭১****৮৬৭৯ নম্বরে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
সদ্য ওয়ার্কশপে রেলের মালামাল চুরির পর আটক দুই চোরকে সমঝোতার ভিত্তিতে ছেড়ে দেওয়া এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ভাঙানোর অভিযোগও উঠেছে সালামত উল্লাহর বিরুদ্ধে।
রেলওয়ে কর্মীদের প্রচলিত ভাষায় ‘ভগবান ডিউটি’ বলতে অফিসে বা কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা বহাল রেখে মাস শেষে বেতন পাওয়াকে বোঝানো হয়। লোকবল সংকটের মধ্যেই এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ। ভগবানে থাকা জনবলের নামে টিএ বিল তৈরি করে রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অস্ত্র শাখায় কাগজে-কলমে মোট ৮০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য থাকলেও সবাই নিয়মিত ডিউটি করেন না। অনুপস্থিত বা ‘ভগবান ডিউটি’তে থাকেন হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারী, সিপাহি মো. আরিফুল ইসলাম, জিয়া উদ্দিন, মো. সোহেল রানা, কেশুয়া চন্দ্র কপালী, মো. নাজিম উদ্দীন চৌধুরী, মিঠুন চক্রবর্তী, আজিমুল হক সুমন, মো. মিজানুর রহমানসহ প্রায় ১২ জনের বেশি সদস্য।
এ ছাড়া হাবিলদার মো. মনির২০ হোসেন, হাবিলদার মো. জয়নাল আবেদিন, সিপাহি কেশুয়া চন্দ্র কপালী এবং সিপাহি মোহাম্মদ মাহমুদুল ইসলাম মাসে চার থেকে পাঁচ দিন ডিউটি করে বাকি সময় অনুপস্থিত থাকেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সদস্য বলেন, ‘ভগবান ডিউটি’ করার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা করে মাসোহারা নেন সালামত উল্লাহ।
নির্দিষ্ট লাইনে ডিউটি না করেও ২৬-২৮ দিনের টিএ (ট্রাভেলিং অ্যালাউন্স বা ভ্রমণ ভাতা) বিল বানানো হয় অনেক সদস্যের নামে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ‘ভগবান ডিউটি’তে থাকা প্রত্যেক সদস্যের নামে মাসিক চুক্তিতে আলাদা টিএ বিল করা হয় এবং এসব বিলের অর্ধেক যায় সালামত উল্লাহর পকেটে। ভুয়া টিএ বিলের কাগজে তিনি নিজেই স্বাক্ষর করে তা অনুমোদন করান বলে অভিযোগ।
একাধিক নথি থেকে জানা যায়, সালামত উল্লাহ নিজের নামেও টিএ বিল তৈরি করেন এবং বিভাগের সব টিএ বিল অনুমোদিত হয় তাঁর স্বাক্ষরে। কমান্ড্যান্ট ও চিফ কমান্ড্যান্টের আশকারায় সংবাদ প্রকাশের পরও এটি বারবার ঘটছে বলে অভিযোগ। বিশ্লেষণে জানা যায়, সদর কমান্ড্যান্ট মোরশেদ আলম ও চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলাম এখান থেকে প্রতিনিয়ত ভাগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রেনে এসকর্ট ডিউটির ক্ষেত্রেও লোকবল সংকট দেখিয়ে পর্যাপ্ত জনবল না দিলেও হিসাবের খাতায় দিনে ৭ থেকে ৮টি ট্রেনের এসকর্ট ডিউটির নামে টিএ বিল করা হয়। এসকর্ট ডিউটি পেতেও সালামত উল্লাহকে আলাদা কমিশন দিতে হয় এবং এর মাধ্যমে মাথাপিছু ৭-৮ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। সিপাহি আজিমুর রহমান সুমন ও সিপাহি মো. মিজানুর রহমান ‘ভগবান ডিউটি’তে থাকলেও তাঁদের ‘ফাইভ আপ’ ট্রেনের ডিউটি দেখিয়ে টিএ বিল করা হয় বলেও একটি গণমাধ্যমে তথ্য উঠে এসেছে।
সিপাহি ওমর ফারুক, সিপাহি মো. মতিয়ার, সিপাহি শাহাদাত হোছাইন খোকন ও সিপাহি এনামুল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে সালামত উল্লাহর ব্যক্তিগত ও বাসাবাড়ির কাজ করে সময় পার করছেন বলে অভিযোগ। অথচ একই ব্যক্তিদের নামে টিএ/ডিএ বিল তৈরি করা হচ্ছে, যা সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ।
এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটি সার্কেল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে টিএ বিলের ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয় সালামত উল্লাহকে। কোনো মাসে ফাঁক গেলে কমান্ড্যান্ট ও চিফ কমান্ড্যান্টের দোহাই দিয়ে বদলির হুমকি দেওয়া হয় বলে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে। রেলওয়ের অনেকের মতে, ভুয়া টিএ বিল বাবদ মাস শেষে ঈদ বোনাসের মতো উপরি আয় এখন রেলওয়েতে ‘ওপেন সিক্রেট’।
ক্ষুব্ধ আরএনবি সদস্যরা
বদলি বাণিজ্য ও মাসিক এসকর্ট-টিএ বিলের কমিশন বাণিজ্যের কারণে আরএনবি সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাব-ইন্সপেক্টর বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর জন্ম হয়েছে স্টাফ শোষণ-নিপীড়নের জন্য। স্টাফদের ঘাম-ঝরানো টাকা খাওয়া বন্ধ না হলে এই বাহিনীর বেপরোয়া আচরণ বন্ধ হবে না। অনেক হাবিলদার-নায়েক-সিপাহির অ্যাকাউন্টে ভুয়া টিএ বিলের টাকা ঢোকে। তা দিতে দেরি করলে ইন্সপেক্টর, চিফ ইন্সপেক্টররা অনেক সময় বকাবকিসহ চোখ রাঙান। এক কথায়, আমরা স্যারদের কাছে জিম্মি। প্রতিবাদ করলে শাস্তিস্বরূপ কষ্টকর কোনো সার্কেলে বদলি করে দেওয়া হয়। ফলে আবার তাঁদের ম্যানেজ করে সুবিধাযুক্ত স্থানে ফিরতে হয়।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহর সরাসরি সাক্ষাৎ না পেয়ে ০১৮****৪০০৭ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও দুই দিনে তিনি কোনো ফোন রিসিভ করেননি।
সালামত উল্লাহর বিরুদ্ধে এসব অনিয়ম নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলে তিনি নিজেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবাদ ছাপিয়ে মূল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ। একটি সুষ্ঠু তদন্তে এসব অভিযোগে জড়িতদের বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব, যা বাহিনীতে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে কমান্ড্যান্ট মোরশেদ আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হলে তিনি জানান, এসব বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কোনো এখতিয়ার তাঁর নেই। তিনি আরও বলেন, তিনি এখানে নতুন এসেছেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, “নিয়মবহির্ভূতভাবে ভুয়া টিএ-ডিএ বিল নিয়ে কারসাজি অফিসের বিধিমালা লঙ্ঘনের শামিল। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি 

















