চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি। অনুকূল আবহাওয়া, চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বাজারে সন্তোষজনক দাম—এই তিন কারণে জেলার পাটচাষিরা এবার লাভের প্রত্যাশা করছেন। কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে এবার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় প্রায় ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দাম ধরে হিসাব করলে জেলায় পাট কেনাবেচায় প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে।
চলতি বছর জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাট চাষের জমি বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর।
গত মৌসুমে জেলায় ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন পাট উৎপাদিত হয়েছিল। এবার কৃষি বিভাগ ৪৯ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ জমির পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ হয়েছে। এ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ২০০ টন।
বাকি ১৮ শতাংশ জমির পাট কাটা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মৌসুমজুড়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে পাটের ফলন ভালো হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি পাওয়ায় পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজও তুলনামূলক সহজ হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনা, উন্নতমানের বীজ ও সময়মতো সার সরবরাহ চাষিদের পাট আবাদে উৎসাহিত করেছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মিতা সরকার জানান, সরকারি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো পাওয়ায় এবার পাটের আবাদ ও উৎপাদন উভয়ই বেড়েছে। প্রতি মণ পাটের গড় দাম ৪ হাজার ৩০০ টাকা ধরে হিসাব করলে জেলায় প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার পাটের বাজার তৈরি হতে পারে বলেও জানান তিনি।
রাজশাহী পাট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে। এটি গত বছরের তুলনায় প্রায় ২১ হাজার কুইন্টাল বেশি।
এদিকে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় সন্তুষ্ট চাষিরাও। বাঘার মনিগ্রাম এলাকার কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে পাটের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছিল। তবে এবার ফলন ও দাম দুটোই ভালো হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভের আশা করছেন তিনি।
মোহনপুরের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ এবার সহজ হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
পবার কৃষক রবিউল ইসলাম চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। তিনি জানান, এবার ভালো লাভ হচ্ছে। তবে শ্রমিকের উচ্চ মজুরি এবং পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির সংকট এখনো কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা।
বাগমারা ও চারঘাটের কৃষকরাও পাটের বর্তমান বাজারদরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দাম ভালো থাকলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে পাট চাষে কৃষকরা আগ্রহী হবেন।
রাজশাহীর উৎপাদিত পাটের বাজার শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জেলার পাট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। প্রক্রিয়াজাত পাটপণ্যের চাহিদা থাকায় উৎপাদিত পাটের একটি অংশ বিদেশেও যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, পাটের উৎপাদন ও দাম বাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার সম্ভাব্য লেনদেন স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের আয় ও ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
তবে কৃষকরা যাতে পাটের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো, সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সরকারি উদ্যোগে গুদামজাতকরণ সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন এই অর্থনীতিবিদ।
সব মিলিয়ে ভালো ফলন ও বাজারদর রাজশাহীর পাটচাষিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে পাট শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, একই সঙ্গে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী প্রতিনিধি 


















