দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদকে কাজে লাগানোর উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সুযোগ দিয়ে নতুন একটি চুক্তি করা হয়েছে। তবে চুক্তির শর্ত ও বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়ায় দেশটির জনগণের একটি অংশের মধ্যে সার্বভৌমত্ব, লাভের ভাগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অনেকে মনে করছেন, বিপুল তেলসম্পদ কাজে লাগাতে পারলে এই চুক্তি ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার চুক্তিটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার বিশাল প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। কারাকাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটির তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ শনিবার বলেন, মাটির নিচে পড়ে থাকা অব্যবহৃত সম্পদকে উৎপাদনে এনে তা ভেনেজুয়েলার মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ না করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলেও কেউ কেউ এর সমালোচনা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে আশঙ্কা করছেন, এতে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তেলসম্পদ থেকে দেশটি প্রত্যাশিত সুবিধা নাও পেতে পারে।
কারাকাসের ৬৮ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী যিশুস সালাজার বলেন, এই উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কে—ভেনেজুয়েলা নাকি যুক্তরাষ্ট্র—তা এখনো পরিষ্কার নয়। তাই তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চান।
নিষেধাজ্ঞার পর নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ
দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরোকে জানুয়ারিতে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার পর ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ আরও বেড়েছে। মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে চলার চাপ রয়েছে তার সরকারের ওপর।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন দল জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিনিয়োগের উদ্যোগকে তারা সমর্থন করে। তাদের মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন।
দেশটির অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য ভেনেজুয়েলার সরকার দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে আসছে। এর মধ্যেই রদ্রিগেজ প্রশাসন খনিজ ও জ্বালানি খাতে সংস্কার এনে বিদেশি বিনিয়োগ এবং বেসরকারি মূলধনের জন্য ক্ষেত্রগুলো আরও উন্মুক্ত করেছে। ওয়াশিংটনও মাদুরো আমলে তেল খাতের ওপর আরোপ করা কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
বাড়ছে তেল উৎপাদন, তবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সময় লাগবে
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন প্রায় ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। তবে প্রায় ২৫ বছর আগে দেশটি যে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করত, বর্তমান উৎপাদন এখনো তার তুলনায় অনেক কম।
নতুন চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য উৎপাদনকে আবার আগের উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি কাটিয়ে উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
কারাকাসের ইনস্টিটিউট অব হায়ার স্টাডিজ ইন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইইএসএ)-এর অধ্যাপক ও প্রকৌশলী অসওয়ালদো ফেলিজোলা মনে করেন, উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তব সুফল পেতে অন্তত তিন থেকে চার বছর প্রয়োজন হতে পারে।
তার মতে, ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পেট্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা বা পিডিভিএসএর একার পক্ষে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা কঠিন।
সংকটের মধ্যে বড় অর্থনৈতিক প্রত্যাশা
২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি প্রায় ৮০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যান। বর্তমানে দেশটির নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয় নিয়ে তীব্র বৈষম্য রয়েছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন তেল চুক্তি থেকে ভবিষ্যতে ২০ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে। তবে এই অর্থ কীভাবে এবং কোন সময়সীমায় সরকারের কোষাগারে আসবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তেল উৎপাদন বাড়লেও এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারি কর্মকর্তা ৭৪ বছর বয়সী কার্লোস বাকো বলেন, পণ্যের দাম ও ডলারের মূল্য বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে অরিনোকো থিংকট্যাংকের বিশ্লেষক এলিয়াস ফেরার মনে করেন, চুক্তিটি আগের পরিস্থিতির তুলনায় ইতিবাচক। তার যুক্তি, এতদিন যে তেল উত্তোলন করা হয়নি, তা উৎপাদনে এলে রয়্যালটি ও অন্যান্য রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ভেনেজুয়েলার সাবেক জ্বালানি উপমন্ত্রী ও আইনজীবী ডলোরেস ডোবারোর মতে, পরিকল্পনাটি স্বচ্ছতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি দেশটির তেলশিল্প পুনর্গঠনের বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন তেল চুক্তি ভেনেজুয়েলার সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাতে পারে; আবার চুক্তির শর্তে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া সন্দেহ আরও গভীর হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















