ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান। সোমবারের এই হামলার মধ্য দিয়ে কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। হামলায় স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
তবে জর্ডানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এর আগে রোববার হরমুজ প্রণালীর একটি ছোট দ্বীপে ইরানের রকেট উৎক্ষেপণ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সম্ভাব্য মাইন বা বিস্ফোরক ব্যবহারের ঝুঁকি ঠেকাতেই ওই অভিযান চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মাইন পাতা ইউনিটগুলোর বিরুদ্ধে সীমিত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছে মার্কিন বাহিনী।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, ওই মার্কিন হামলায় তাদের কয়েকজন সদস্য হতাহত হয়েছেন। এর পরই জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলাকে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব হিসেবে তুলে ধরে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ছয় মাসে পৌঁছানোর পর নতুন করে সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হলো। সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক সংঘাত কিছুটা কমলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে রেখেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। ফলে এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ থেকে সমুদ্রের মাইন অপসারণের কাজ শেষ করেছে মার্কিন বাহিনী। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও স্থায়ী শান্তি নেই
সংঘাত বন্ধে কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। পাকিস্তান ও কাতারসহ কয়েকটি দেশ দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।
এপ্রিল মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। জুনে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধানে রূপ নেয়নি।
পরবর্তীতে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করে। ইরানের বন্দর ও জ্বালানি খাতকে ঘিরে চাপ দেশটির অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববাজারে
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা এবং দেশটির মিত্রদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছে। কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তেল, জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি কিছু অঞ্চলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ মার্কিন হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও ৮৫ ডলারের বেশি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়িয়েছে। আগামী নভেম্বরে দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে যুদ্ধের লক্ষ্য ও ফলাফল নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন বিরোধী ও কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতা।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে মার্কিন সিনেটর জ্যাক রিড বলেন, ছয় মাস পরও যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি। তার মতে, দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
জর্ডানে সর্বশেষ হামলার মধ্য দিয়ে এখন সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা বাড়লে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















