দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫ হাজার নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে ডায়ালাইসিস বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে মোট ২ হাজার ৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ১২০ জনকে নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনে ৯০ জন, পাবনায় ২০ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে সিলেটসহ দেশের আরও কয়েকটি স্থানে বড় পরিসরে এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশের প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মসূচির আওতায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আবেদনকারীর সরকারি চাকরিতে কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ হতে হবে এবং বয়স ৪০ বছরের মধ্যে থাকতে হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডায়ালাইসিস সেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরিতে প্রতি ব্যাচে ৫০ থেকে ১০০ জন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) ও ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একটি বৈঠকে জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে সভার কার্যবিবরণী পাঠানো হয়।
এর আগে ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় অনুষ্ঠিত বৈঠকেও দেশের প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বর্তমানে ডায়ালাইসিস সেবা বড় শহর ও রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসা নিতে দূরবর্তী স্থানে যেতে হয়।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪৬টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। এর বড় একটি অংশ, প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ, রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা এখনও সীমিত।
সরকারের পরিকল্পনায় জেলা পর্যায়ের ডায়ালাইসিস কেন্দ্রগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে এ সেবা সম্প্রসারণের জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথাও রয়েছে।
ডায়ালাইসিস সেবার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট মোকাবিলায় প্রবেশনারি চিকিৎসকদের নিজ নিজ উপজেলায় পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো উপজেলায় উপযুক্ত চিকিৎসক পাওয়া না গেলে পার্শ্ববর্তী উপজেলা কিংবা জেলা থেকে চিকিৎসক পদায়ন করা হবে।
এ ছাড়া অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও কনসালট্যান্টদের স্বয়ংক্রিয় পদায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প দ্রুত একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে রাজধানীর মিরপুরে মেডিকেল কলেজের পরিবর্তে ৬০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি জেনারেল হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক ডায়ালাইসিস সেবার ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিডনি রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















