ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টে দুই বিচারপতির নজিরবিহীন প্রকাশ্য বিরোধকে কেন্দ্র করে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় বিচারপতিদের এই দ্বন্দ্ব আদালতের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
একটি বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির তদন্তকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। বিষয়টি ইতোমধ্যে নির্বাচনী রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। আসন্ন নির্বাচনে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন কট্টর ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে দুই বিচারপতির মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার কথা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
বিরোধের এক প্রান্তে রয়েছেন বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরেস। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বলসোনারো পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক শিবিরের অন্যতম প্রধান আইনি প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে রয়েছেন বিচারপতি আন্দ্রে মেন্ডোনকা। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর মনোনয়নেই তিনি সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পান।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দুই বিচারপতির বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় মেন্ডোনকা একটি পুলিশি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে কারাগারে থাকা ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোর পাঠানো কয়েকটি বার্তার তথ্য ছিল। এসব বার্তা কথিতভাবে মোরেসের সঙ্গে যুক্ত একটি নম্বরে পাঠানো হয়েছিল। জালিয়াতির তদন্তের মধ্যে থাকা ওই ব্যাংকার বার্তাগুলোতে বিচারপতির কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর মোরেস পাল্টা মেন্ডোনকার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনেন। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয়।
ব্রাজিলের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় আলেকজান্দ্রে দে মোরেস বর্তমানে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি ‘বিগ অ্যালেক্স’ নামে পরিচিত।
দেশটির সাম্প্রতিক প্রায় সব বড় রাজনৈতিক ও বিচারিক বিতর্কেই কোনো না কোনোভাবে তার ভূমিকা দেখা গেছে। বিশেষ করে জাইর বলসোনারো ও তার রাজনৈতিক অনুসারীদের সঙ্গে মোরেসের দীর্ঘদিনের সংঘাত তাকে ডানপন্থীদের প্রধান বিরোধী চরিত্রে পরিণত করেছে।
গত বছর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মোরেস। ব্যর্থভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় ভূমিকার অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্টকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২৩ সালে নির্বাচনী আদালতের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মোরেস। সে সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্বাচনী প্রচারে গণমাধ্যমের অপব্যবহারের অভিযোগে বলসোনারোকে সরকারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ঠেকাতেও মোরেস কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার নির্দেশে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার ঘটনাও ঘটেছে।
২০২৪ সালে আদালতের নির্দেশনা না মানার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স ব্রাজিলে প্রায় ৪০ দিনের জন্য বন্ধ ছিল। এই পদক্ষেপ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
মোরেসের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তিনি বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রক্ষণশীল মতামত ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনও বিচারিক ক্ষমতার ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো বিভিন্ন সময়ে মোরেসকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন এবং তাকে স্বৈরাচারী আচরণের জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
তবে মোরেসের ভূমিকার অন্য একটি দিকও রয়েছে। ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও নির্বাচনী অপপ্রচার মোকাবিলায় তার ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট লুলা।
মোরেসকে ঘিরে বিতর্ক ব্রাজিলের সীমারেখা ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়ায় তার ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন মোরেসের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলসোনারোর বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছিলেন। পরে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে মোরেস প্রকাশ্যে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলাকে কূটনৈতিক উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান।
সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির প্রকাশ্য বিরোধ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ব্রাজিলের রাজনীতি নতুন করে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগোচ্ছে। ফলে আদালতের এই সংঘাত বিচারিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নির্বাচনী রাজনীতিতেও আরও বড় প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।
মঙ্গলবারের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে দুই বিচারপতির অবস্থান সরাসরি সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালতের এই নজিরবিহীন প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিবেশে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















