রাশিয়ার ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের হাতে পৌঁছাতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পিএসি-৩ (PAC-3) মডেলের এসব অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য মূল্য ২১০ কোটি ডলার। ইউক্রেনের মিত্র ইউরোপীয় দেশ ও কানাডা এ কেনাকাটার অর্থায়ন করবে। চুক্তির আওতায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্বে থাকবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান জেলেনস্কি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনার চেয়ে ইউক্রেনের কাছে এখনই এসব ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানো বেশি জরুরি। বিশেষ করে শীত মৌসুম সামনে রেখে রাশিয়া দেশটির জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দাবি, গত দুই সপ্তাহে দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ৩০টির বেশি হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এ পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র?
প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও অন্যান্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা। বিশেষ করে পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক চাহিদা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন করে উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বছরে প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদিত হয়। ফলে ইউক্রেনের জন্য অনুমোদিত বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে উৎপাদন সক্ষমতা ও সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত চুক্তিতে আগে থেকে মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে নতুন করে উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউক্রেনের অর্থায়ন করবে মিত্র দেশগুলো
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ বিক্রির মাধ্যমে ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশীদার দেশের নিরাপত্তা জোরদার হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য বাস্তবায়নেও এটি ভূমিকা রাখবে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ের আর্থিক সহায়তা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউক্রেন সাপোর্ট লোনের আওতায় বরাদ্দ করা তহবিল থেকে এ কেনাকাটার ব্যয় মেটানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থ এ চুক্তিতে সরাসরি ব্যয় হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে টানাপোড়েন
ইউক্রেনের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য এবং মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার প্রসঙ্গে দেশটির নেতৃত্ব নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন। তবে ২০ অক্টোবর অসলোতে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জি-২০ বৈঠকে লাভরভকে ঘিরে কূটনৈতিক প্রতিবাদ
এদিকে জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের উপস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। আনুষ্ঠানিক ছবি তোলার সময় কয়েকজন ইউরোপীয় প্রতিনিধি দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আয়োজনে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড রাশিয়ার ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে কে আগ্রাসন চালাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে স্পষ্ট। ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার জন্যও রুশ সরকারকে দায়ী করেন তিনি।
দ্রুত সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা
জেলেনস্কি এর আগে জানিয়েছিলেন, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অনুমোদন পেতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউক্রেনকে প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ চলমান রুশ হামলার কারণে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বিক্রির অনুমোদন পাওয়া আর বাস্তবে ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাওয়া এক বিষয় নয়। উৎপাদন, সরবরাহের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার ওপর নির্ভর করবে ইউক্রেন কত দ্রুত এসব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাবে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এর আগে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় মস্কো এবং পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমানে রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ভবিষ্যতে দেশটির প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলো কত দ্রুত ইউক্রেনে পৌঁছাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















