ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, একটি সভ্য সমাজে এমন অবিবেচক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন রায় প্রত্যাশিত নয়।
গত ২৪ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে রায় দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। ১১২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা প্রত্যাহার না করায় নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধ্যক্ষের নির্দেশেই হত্যার পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণে বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে রায়ে বলা হয়।
তবে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না বলে মনে করেছে হাইকোর্ট। বিশেষ করে শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম ও আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার মতো ন্যূনতম প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তারা সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী ছিলেন।
হাইকোর্টের মতে, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১৬টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাত্র দুটি সাজা গ্রহণযোগ্য। বিচারিক পর্যায়ে সংবেদনশীলতার ঘাটতিও আদালতের নজরে এসেছে।
রায়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারিক দায়িত্ব পালনের আগে দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি বিচারের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত তাকে দায়রা এখতিয়ার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল
হাইকোর্ট দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। তারা হলেন—মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।
যাদের সাজা কমে যাবজ্জীবন
চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন—নুর উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের ও উম্মে সুলতানা পপি।
মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস ১০ জন
হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পাঁচ দিন পর ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের গুরুতর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে গঠিত বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চে নুসরাত হত্যা মামলাটিও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করা হয়। শুনানি শেষে ২৪ আগস্ট বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
ফেনী প্রতিনিধি 


















