আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। বরফশীতল পানি, পাথর ও কাদার প্রবল স্রোতে একাধিক গ্রাম কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ।
উদ্ধারকর্মীরা দুর্গত এলাকাগুলোতে কাদার মধ্যে নেমে জীবিতদের সন্ধান চালাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারে নেপালের সেনাবাহিনী প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এ পর্যন্ত ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও প্রায় ৯১০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। চীনও জানিয়েছে, নেপালে অবস্থানরত তাদের প্রায় ১০০ নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না; এই সংখ্যা নেপালের নিখোঁজ তালিকার বাইরে।
নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ নাগরিকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদেরও নিখোঁজদের তালিকায় থাকার কথা জানিয়েছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড।
তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং এলাকায়ও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ভূমিধসজনিত দুর্যোগে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিব্বতে প্রায় ৮০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর ও স্পিডবোট উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়েছে।
‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’র মতো ধেয়ে আসে কাদা
দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে পরিবেশ-ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রুথ গ্যাম্বল আকস্মিক কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতকে ‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, এই স্রোত নেপালের ভেতরে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তিমুরে এলাকায় উদ্ধার হওয়া ৩৫ বছর বয়সী নেপালি কাস্টমস কর্মকর্তা ওমকার যোশি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, পুরো এলাকা যেন বিশাল এক কবরস্থানে পরিণত হয়েছে—চারদিকে শুধু বালি, নুড়িপাথর ও ধ্বংসস্তূপ।
হিমবাহ ধস থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (USGS) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি হিমবাহ ধসে পড়ার পরই এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূত্রপাত। প্রথমদিকে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে শনাক্ত করা হলেও পরবর্তী ভূকম্পন-তথ্য বিশ্লেষণে সেটি হিমবাহ ধস ও ব্যাপক ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফশীতল পানি, পাথর ও কাদার স্রোত মুহূর্তের মধ্যে নিচের জনপদগুলোতে আঘাত হানে। এতে ঘরবাড়ি পানিতে ও কাদায় ডুবে যায়, সেতু ও বাঁধ ভেঙে পড়ে এবং বহু যানবাহন স্রোতে ভেসে যায়।
আরও বন্যার আশঙ্কা
উদ্ধার অভিযান চললেও দুর্যোগের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ভূমিধসে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ উপত্যকার কিছু অংশে পানি আটকে দিয়েছে। ফলে নতুন করে বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, নেপাল-চীন সীমান্তের একটি নদীর উজানে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বাধা তৈরি হয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
এ কারণে নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের নিয়েও উদ্বেগ
নিখোঁজদের মধ্যে নেপালে ভ্রমণে যাওয়া ট্রেকারদের পাশাপাশি তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত থেকে তীর্থযাত্রা শেষে ফেরার পথে থাকা বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভারতীয় আধ্যাত্মিক নেতা সদগুরু জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া অনেক তীর্থযাত্রী সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৈলাস থেকে ফেরার সময় একটি অভিবাসনকেন্দ্রে তারা বন্যার কবলে পড়েন। এক ভিডিও বার্তায় ঘটনাটিকে তিনি ‘ভয়াবহ ও নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে তিব্বতের এই দুর্যোগে প্রাণ হারানোদের জন্য প্রার্থনা করার কথা জানিয়েছেন দালাই লামা।
জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা এবং হিমবাহ ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বরফ গলার পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে নিখোঁজদের সন্ধান এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কারণে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এখনো চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















