দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত জ্বালানি সংকটবিষয়ক আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দ্রুত প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি সপ্তাহ থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রের ক্ষেত্রে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ প্রযোজ্য হবে না বলেও জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ায় বর্তমানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
২৬ অফশোর ব্লকে অনুসন্ধানের উদ্যোগ
সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’-এর আওতায় ২৬টি অফশোর ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব ব্লকের মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্র ও ১১টি অগভীর সমুদ্র এলাকায় অবস্থিত।
আগামী নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র প্রক্রিয়া চলবে। একই সঙ্গে নতুন অনশোর বিডিং রাউন্ড চালুর প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্সকে আরও সক্ষম করতে নতুন দুটি ড্রিলিং রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি ড্রিলিং রিগ রয়েছে।
এ ছাড়া অনুসন্ধান, কূপ খনন, সিসমিক জরিপ ও অফশোর বিডিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং আটটি কূপে ড্রিলিং কার্যক্রম চলছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা তিনগুণ করার পরিকল্পনা
দেশের একমাত্র অপরিশোধিত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।
এ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করবে। গত ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও আইডিবির মধ্যে প্রকল্পটির অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে বলে সংসদে জানানো হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ছাদ ও ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি শুল্কমুক্ত নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে সরকার।
জ্বালানি তেলের দাম প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের প্রভাবে বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশগুলোতে চোরাচালান কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সমন্বিত জ্বালানি মূল্য ব্যবস্থার আওতায় সরকারকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগের সরকারের আমলে গড়ে ওঠা আমদানিনির্ভর নীতির পরিবর্তে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করছে।
এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। সংকট মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর জ্বালানি সেল গঠনেরও আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং পাবনা-১ আসনের বিরোধীদলীয় সদস্য নাজিবুর রহমান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















