বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ সব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধির আওতায় ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতে ইসলামী দলীয় সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের উত্থাপিত বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে সরকার।
বেনজীর আহমেদের বিষয়ে তিনি বলেন, তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ যাচাই এবং দেশে ও বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদের তথ্য সংগ্রহ ও সেগুলো জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার আইনের শাসন ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, গত ৩০ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ‘হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’কে বাংলাদেশের পক্ষে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সেন্ট লুসিয়ায় বেনজীর আহমেদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও উপযুক্ত সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা যায়নি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান
সংসদে আলোচনায় ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংসতার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ বিভিন্ন ঘটনায় ৭ থেকে ৮ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে।
তিনি জানান, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ১ হাজার ৪৮টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা ১৩৩টি। নথিভুক্ত গুমের সংখ্যা ৬৮৪টি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৭০৯।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে জমা দেওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জনকে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে জোরপূর্বক গুম করার অভিযোগ রয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২ হাজার ৬৩০ জন নিহত হয়েছেন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ২ হাজার ৬৯৩টি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জুলাইয়ের সহিংসতায় নিহত প্রায় ১,৪০০
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। তবে বেসরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার দাবি, নিহতদের বড় অংশ সামরিক রাইফেল ও শটগান থেকে ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারান, যেসব অস্ত্র সাধারণত নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহারে থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমেদ ও মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ অতীত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং নির্যাতন, গুম ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
তিনি জানান, মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে। গুম ও শতাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ গঠন করেছে।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় সংসদের সহযোগিতা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়ে সরকারের সমালোচনার পরিবর্তে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ করতে সহযোগিতা করার জন্য বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আলোচনা শেষে সংসদে বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। পরে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত সংসদকে অবহিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় গত ১২ জুন দুবাইয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে বলে সংসদে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গ্রেপ্তারের পর সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিষয়টি অবহিত করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানোর প্রয়োজন ছিল। সে অনুযায়ী ১৪৪ পৃষ্ঠার প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদ করে তিন দিনের মধ্যেই কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠানো হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

















