কারা ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, মানবিক, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
মঙ্গলবার কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গত দুই বছরে কারা ব্যবস্থাপনায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও অগ্রগতি তুলে ধরেন তিনি।
কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারাগার শুধু বন্দিদের আটক রাখার স্থান নয়; নিরাপত্তার পাশাপাশি সংশোধন, মানবিকতা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনর্বাসনও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস বাংলাদেশ’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান যুগোপযোগী করার কাজ চলছে।
তিনি জানান, মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ক্যাশলেস কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এতে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি কারা প্রশাসনের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে সদর দপ্তর ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনবল সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮৯৯টি নতুন পদ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও ১ হাজার ৫০০টি পদের চাহিদা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক, মেধাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারাগারে বন্দির অতিরিক্ত চাপ কমাতে নতুন কারাগার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দুটি কেন্দ্রীয় ও চারটি জেলা কারাগার চালু হয়েছে। প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়াতে ঢাকা বিভাগকে দুটি বিভাগে ভাগ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ঢাকা জেলে রুটি তৈরিতে রুটি মেকার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও একই মানের রুটি উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কারাগারগুলোকে আরও পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক বলেন, দেশব্যাপী কারাগারগুলোকে কারা অধিদপ্তরের নিজস্ব ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। বন্দিদের টেলিফোন কল ও সাক্ষাৎ ব্যবস্থাও ডিজিটালাইজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রমে এআইভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ভিডিও কলের মাধ্যমে সাক্ষাতের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে।
বন্দিদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করার অংশ হিসেবে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ সাবান উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। উৎপাদিত সাবান বন্দি ও কারা কর্মীদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কর্মসূচি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের সুপারিশ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ৭৭টি অ্যাম্বুলেন্স টিঅ্যান্ডইভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন পর্যায়ের কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী, সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর, ডেপুটি জেলার, জেলার ও জেল সুপারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষা, বন্দি পালানো প্রতিরোধ, মাদক ও অনিয়ম দমন এবং মানবিক সেবায় বিশেষ অবদান রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ মূল্যায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নতুন কারাগারে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের সর্বশেষ তথ্যও জানানো হয়। কারা মহাপরিদর্শকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে মোট ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে গেলেও ১ হাজার ৫৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ৮২৬ জনের মধ্যে ১৬৬ জনের এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে দেশে মোট ৭৫টি কারাগার রয়েছে উল্লেখ করে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারাগারগুলোর খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর মধ্যে ২১টি কারাগার সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতেও কারাগারের মৌলিক সেবার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















