কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, যুদ্ধের নতুন পরিস্থিতিতে তেহরান নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। সামরিক অভিযান, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলেও তিনি দাবি করেন।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতি ওয়াশিংটনের
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়ানোর মাধ্যমে তেহরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য
পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী নিয়েও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসার পর এই জলপথের নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প প্রণালী’ রাখা যায় কি না। পরে অবশ্য তিনি ইঙ্গিত দেন, মন্তব্যটি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা
ইরানে মার্কিন হামলার পর ইরানও পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব হামলার দায় কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। একটি সৌদি জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগ
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট দাবি করেছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক মানুষ।
ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি ওই ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মতো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে অভিযান চালায় না।
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শয়তান’ বললেন ইরানের প্রধান আলোচক
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। তিনি ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডকে ‘শয়তানের মতো আচরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইরানের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এক ব্যবসায়ী বলেন, যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং দুই পক্ষের আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়া উচিত।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের সংঘাত
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান সংঘাতের সূচনা হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং আগে থেকে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতিও ভেঙে পড়ে।
ইরানকে পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি ইসরাইলের
এদিকে ইসরাইলও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি ধর্মীয় উৎসবের সময়ে ইরান হামলা চালালে ইসরাইল ‘প্রচণ্ড শক্তি’ দিয়ে জবাব দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকির ঘটনায় আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
















