সময়মতো বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি মৌসুমে নওগাঁয় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে মৌসুমের শুরুতেই শুকনা পাটের বাজারদর আশাব্যঞ্জক হওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন জেলার কৃষকরা। এতে আগামী মৌসুমে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে জেলায় পাটের আবাদ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২১-২২ মৌসুমে ৫ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করে উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ মৌসুমে আবাদ কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩৩০ হেক্টরে এবং উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন।
২০২৩-২৪ মৌসুমে ৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়, উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন। পরের মৌসুমে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে আবাদ আরও কমে ৩ হাজার ৫৫০ হেক্টরে নেমে আসে এবং উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৯৬৫ মেট্রিক টন। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ বছর সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন।
ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জমি থেকে পাট কেটে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে ধুয়ে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি শুরু করেছেন। মৌসুমের শুরুতেই ভালো দাম পাওয়ায় তাদের মধ্যে সন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ শুকনা পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, পরিচর্যা, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, ধোয়া ও শুকানোসহ গড়ে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে প্রতি বিঘায় খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করছেন কৃষকরা।
বদলগাছী উপজেলার কাষ্টডোব গ্রামের কৃষক মোবারক আলী এ বছর এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। শুরুতে বাজারদর নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় থাকলেও ফলন ও দাম দুটোই ভালো হওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার টাকা। ওই জমি থেকে ১২ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী যার মূল্য ৪৮ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে তার নিট লাভ হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার টাকা।
মান্দা উপজেলার বড় বেলালদহ গ্রামের কৃষক আজিমুদ্দিন কাজী দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি পেয়েছেন ২২ মণ পাট। প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা দরে এর বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৮৮ হাজার টাকা। দুই বিঘায় তার মোট খরচ হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। ফলে খরচ বাদ দিয়ে তার নিট মুনাফা হয়েছে ৫৬ হাজার টাকা।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৮০০ জন পাটচাষিকে সরকারি প্রণোদনার আওতায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক কৃষককে ২৩০ টাকা মূল্যের এক কেজি বীজ, ৯৫ টাকা মূল্যের পাঁচ কেজি ডিএপি সার, ৯০ টাকা মূল্যের পাঁচ কেজি এমওপি সার এবং পরিবহন বাবদ ১৬ টাকা ৫০ পয়সা নগদ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রত্যেক কৃষক পেয়েছেন ৪৪২ টাকা ৫০ পয়সা মূল্যের সহায়তা। এ হিসাবে চলতি মৌসুমে পাটচাষিদের জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, পাটকে আবারও ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কৃষকদের পাট চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে চলতি মৌসুমে ৮০০ জনকে সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খরচ এবং আনুষঙ্গিক ও অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের উৎপাদন খরচের তুলনায় বর্তমান বাজারদর সন্তোষজনক থাকায় পাট চাষে তাদের আগ্রহ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। পাটের তৈরি বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি ভালো বাজারদর অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নওগাঁ প্রতিনিধি 


















