ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের জেরে মিশরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কার মধ্যেই প্রায় এক দশক পর মিশরের রাজধানী কায়রো সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। দুই দিনের সফরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কায়রো পৌঁছান তিনি। সফরে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সি চিনপিংয়ের সঙ্গে রয়েছেন তার স্ত্রী ও চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিয়ুয়ান। কায়রো বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট সিসি ও মিশরের ফার্স্ট লেডি এন্তেসার আমের। এ সময় লোকনৃত্যের মাধ্যমে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পথে দুই পাশে সারিবদ্ধ কিশোরদের অনেকের পরনে ছিল সি চিনপিংয়ের ছবি সংবলিত টি-শার্ট।
সফরকালে চীন ও মিশরের মধ্যে একাধিক অর্থনৈতিক চুক্তি সই হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবহন, জ্বালানি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব নিয়েও দুই নেতা আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সি চিনপিংয়ের এই সফর মিশরের জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীনতার বার্তা দিতে চাইছে কায়রো।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বেড়েছে। ওয়াশিংটন ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। এর প্রভাব চীনা ব্যাংক ও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
চীন ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা। বেইজিং ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।
এর মধ্যেই মিশরের একটি বড় ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইরানকে সহায়তা করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নেওয়া এই পদক্ষেপ কায়রোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চীনা বিনিয়োগে মিশরের বড় অবকাঠামো প্রকল্প
প্রেসিডেন্ট সিসির দীর্ঘ শাসনামলে মিশরের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাজধানী কায়রোর পূর্বদিকে নির্মিত নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস ডিস্ট্রিক্টে চীনের অর্থায়নে একাধিক সুউচ্চ ভবন নির্মিত হয়েছে।
সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলও চীনা বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যে অস্থিরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ আরও বাড়ানো নিয়েও দুই দেশের নেতাদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
সি চিনপিংয়ের সফর উপলক্ষে কায়রোর প্রধান সড়কগুলো সাজানো হয়েছে চীন ও মিশরের পতাকা এবং দুই নেতার ছবি সংবলিত বিলবোর্ড দিয়ে। বিভিন্ন সড়কের সাইনবোর্ডে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের বার্তাও তুলে ধরা হয়েছে।
সফরের দ্বিতীয় দিনে সি চিনপিংয়ের কায়রোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শনের কথা রয়েছে। এর মধ্যে গিজার পিরামিডের কাছে অবস্থিত গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামও রয়েছে।
চীন ও মিশর—দুই দেশই ব্রিকসের সদস্য। ফলে এবারের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে মিশরের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যে চীনের উদ্বৃত্তের পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই বাণিজ্য ভারসাম্য ও মিশরে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
















