ঢাকা ০৬:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিএমএফ কোর্স চলছে, নিয়োগে অনিশ্চয়তা: SACMO পদ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ কতদূর? শার্শায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, ‘শিবিরের কর্মীরা মেধাবী ও উত্তম চরিত্রের’–এমপি আজীজুর রহমান খুচরা সার বিক্রির অভিযোগে কুড়িগ্রামে ডিলারকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা কলকাতায় অগ্নিকাণ্ড: সাংবাদিক দেবাশীষসহ ৫ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু ২৯ জানুয়ারি ‘ইরানের নাগরিকেরা অনেক সমস্যায় আছেন’: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ‘ঢাবিতে অন্যায় মেনে নেওয়া হয় না, গায়ের জোরে কেউ টিকে থাকতে পারেনি’ নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় কাল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বৈঠক, আলোচনায় রোহিঙ্গা ও অভিবাসন রংপুরে একই পরিবারের চার হত্যা: দুই যুবক গ্রেপ্তার, পুলিশের ব্রিফিংয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ডিএমএফ কোর্স চলছে, নিয়োগে অনিশ্চয়তা: SACMO পদ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ কতদূর?

বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও কোর্স শেষ করা শিক্ষার্থীদের সরকারি কর্মসংস্থান, পদসংখ্যা, পদোন্নতি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষেও সরকারি ব্যবস্থায় ম্যাটসে ভর্তি কার্যক্রম হয়েছে এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকেও একাধিক ধাপে শিক্ষার্থী নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ডিএমএফধারীদের সরকারি নিয়োগ নিয়ে নতুন করে দাবি উঠেছে ২০২৬ সালেও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে আইএইচটি ও ম্যাটসের ভর্তি কার্যক্রমের পর অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে প্রথম দফায় ফল প্রকাশ করা হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় দফায় ফল প্রকাশ করা হয় ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি। অর্থাৎ ডিএমএফ-ম্যাটস শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ নয়; বরং সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভর্তি ও একাডেমিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রিতেও একাধিক সরকারি ম্যাটস সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। যেমন, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাট মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টস ট্রেনিং স্কুলের তথ্য ২০২৬ সালেও হালনাগাদ করা হয়েছে।

ডিএমএফের মূল কর্মক্ষেত্র কোথায়?

ডিএমএফধারীদের সরকারি কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত পদ হলো উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO)। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সরকারি দায়িত্ব বিবরণীতে এই পদের কাজ ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো নিয়োগ নথিতেও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের স্থায়ী ও অস্থায়ী শূন্য পদে নিয়োগ এবং পদায়নের নজির রয়েছে। অর্থাৎ পদটি সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বীকৃত জনবল কাঠামোর অংশ।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় বড় প্রশ্ন হচ্ছে—নতুন ডিএমএফধারীদের জন্য এই পদে নিয়মিত নিয়োগ কতটা হচ্ছে?

নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ম্যাটস শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় নিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। একই সময়ে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর কথাও জানানো হয়।

তবে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বড় পরিসরের, দেশব্যাপী সরকারি নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে—এমন হালনাগাদ সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকা সহজলভ্য সরকারি নথিতে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং ২০২৬ সালের আগস্টেও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো নতুন করে তৃণমূল পর্যায়ে SACMO পদ সৃষ্টির দাবি জানাচ্ছে। ২১ আগস্ট ২০২৬-এর এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ সৃষ্টিসহ প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, ২০২৫ সালে নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলা হলেও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান হয়েছে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত সরকারি প্রমাণ নেই।

সরকারি ব্যবস্থায় শূন্য পদ আছে, কিন্তু নিয়োগের পথ স্পষ্ট নয়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান HRM Facility Registry-তে বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ‘Medical Assistant’ পদ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এসব পদ শূন্যও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রিতে Medical Assistant-এর একটি পদ ১১তম গ্রেডে শূন্য দেখানো হয়েছে। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একই পদে দুটি শূন্য পদ ১৬তম গ্রেডে দেখানো হয়েছে।

আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রিতে উন্নয়ন খাতের একটি Medical Assistant পদও শূন্য রয়েছে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের HRM-এ পদ শূন্য থাকা মানেই সেই পদে ডিএমএফধারীদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে—এমন নয়। নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট পদ, নিয়োগবিধি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ছাড়পত্র এবং বিজ্ঞপ্তি—সবগুলো ধাপ প্রয়োজন।

২০২৬ সালেও সরকারি নিয়োগের দাবি কেন?

ডিএমএফ শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের মধ্যে মূল অভিযোগ হলো—শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখে পর্যাপ্ত সরকারি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে নতুন করে বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমাধারী কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় পড়ছেন।

২০২৫ সালের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক বেকার ডিএমএফধারীর কথা বলা হয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থায় SACMO পদে শূন্যতার দাবি করা হয়। এসব সংখ্যা মূলত আন্দোলনকারী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য; তাই এগুলোকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের আগস্টে আবারও নতুন পদ সৃষ্টির দাবি ওঠা থেকে বোঝা যায়, নিয়োগ ও জনবল কাঠামোর প্রশ্নটি এখনো ডিএমএফ পেশাজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়।

বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ আছে

সরকারি নিয়োগে অনিশ্চয়তা থাকলেও ডিএমএফধারীদের জন্য বেসরকারি ও এনজিও খাতে কাজের সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালেও বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থায় SACMO/Medical Assistant ধরনের পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে YPSA-এর সাম্প্রতিক একটি বিজ্ঞপ্তিতে SACMO পদে নিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়।

এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও এনজিওতে ‘Medical Assistant’ পদে ডিএমএফ বা সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা চাওয়া হয়। তবে এসব চাকরির বেতন, দায়িত্ব, নিয়োগের শর্ত ও চাকরির নিরাপত্তা সরকারি চাকরির মতো এক নয়।

উচ্চশিক্ষার দাবিও পুরোনো

ডিএমএফ শিক্ষার্থীদের অন্যতম দীর্ঘদিনের দাবি হলো উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। ২০২৫ সালের আন্দোলনেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কোর্স কারিকুলাম সংস্কার এবং পেশাগত কাঠামো নিয়ে দাবি ওঠে।

অন্যদিকে সরকারি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিভিন্ন নথিতে ডিএমএফধারীদের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা কাজে অংশগ্রহণের সুযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে বর্তমান বিতর্কের মূল জায়গা শুধু ‘কোর্সের স্বীকৃতি আছে কি না’ নয়; বরং কোর্স শেষ করার পর পেশাগত দায়িত্ব, পদ, নিয়োগ, উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির কাঠামো কতটা সুস্পষ্ট—সেটিই বড় প্রশ্ন।

সরকারের পদক্ষেপ কতটা এগিয়েছে?

ডিএমএফ-ম্যাটস ইস্যুতে সরকারের পদক্ষেপকে মোটামুটি চারটি পর্যায়ে দেখা যায়—

প্রথমত, শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ম্যাটসে ভর্তি এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে একাধিক ধাপে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানো হয়।

তৃতীয়ত, SACMO পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল। তবে এর চূড়ান্ত বাস্তবায়নের প্রমাণ আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চতুর্থত, স্বাস্থ্য জনবল কাঠামোতে Medical Assistant/SACMO পদ বিদ্যমান রাখা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের HRM রেজিস্ট্রিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে Medical Assistant পদ এবং শূন্যপদের তথ্য এখনো দেখা যাচ্ছে।

তাহলে বর্তমান অবস্থা কী?

সব তথ্য মিলিয়ে ২০২৬ সালের আগস্টে ডিএমএফের চিত্রকে বলা যায়—‘শিক্ষা চলছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের কাঠামো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।’

একদিকে সরকারিভাবে ম্যাটস শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এবং নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় Medical Assistant/SACMO ধরনের পদ রয়েছে এবং কিছু পদ শূন্যও রয়েছে। কিন্তু ডিএমএফধারীদের প্রত্যাশিত বড় পরিসরের নিয়মিত নিয়োগ, নতুন পদ সৃষ্টি, পদমর্যাদা ও উচ্চশিক্ষার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৫ সালের আন্দোলনের পর নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তার এক বছর পরও ২০২৬ সালের আগস্টে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সংগঠনকে নতুন করে SACMO পদ সৃষ্টির দাবি তুলতে হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত করে যে নিয়োগ সংকটের কাঠামোগত সমাধান এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

সামনে কী প্রয়োজন?

ডিএমএফ-ম্যাটস খাতের সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্টদের মতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—শূন্য সরকারি পদে দ্রুত নিয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি, নিয়োগবিধি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার স্পষ্টতা, SACMO পদের গ্রেড ও ক্যারিয়ার কাঠামো নির্ধারণ, কোর্স কারিকুলামের আধুনিকায়ন এবং উচ্চশিক্ষার বাস্তবসম্মত পথ তৈরি।

কারণ, শুধু প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করলেই একটি পেশাগত শিক্ষাক্রমের সাফল্য নিশ্চিত হয় না। শিক্ষা শেষে প্রশিক্ষিত জনবলকে কোথায়, কী দায়িত্বে এবং কী কাঠামোর অধীনে কাজে লাগানো হবে—তার একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের HRM Facility Registry এবং সাম্প্রতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Editorial Desk

জনপ্রিয় সংবাদ

ডিএমএফ কোর্স চলছে, নিয়োগে অনিশ্চয়তা: SACMO পদ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ কতদূর?

ডিএমএফ কোর্স চলছে, নিয়োগে অনিশ্চয়তা: SACMO পদ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ কতদূর?

Update Time : ১১:২১:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও কোর্স শেষ করা শিক্ষার্থীদের সরকারি কর্মসংস্থান, পদসংখ্যা, পদোন্নতি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষেও সরকারি ব্যবস্থায় ম্যাটসে ভর্তি কার্যক্রম হয়েছে এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকেও একাধিক ধাপে শিক্ষার্থী নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ডিএমএফধারীদের সরকারি নিয়োগ নিয়ে নতুন করে দাবি উঠেছে ২০২৬ সালেও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে আইএইচটি ও ম্যাটসের ভর্তি কার্যক্রমের পর অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে প্রথম দফায় ফল প্রকাশ করা হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় দফায় ফল প্রকাশ করা হয় ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি। অর্থাৎ ডিএমএফ-ম্যাটস শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ নয়; বরং সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভর্তি ও একাডেমিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রিতেও একাধিক সরকারি ম্যাটস সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। যেমন, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাট মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টস ট্রেনিং স্কুলের তথ্য ২০২৬ সালেও হালনাগাদ করা হয়েছে।

ডিএমএফের মূল কর্মক্ষেত্র কোথায়?

ডিএমএফধারীদের সরকারি কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত পদ হলো উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO)। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সরকারি দায়িত্ব বিবরণীতে এই পদের কাজ ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো নিয়োগ নথিতেও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের স্থায়ী ও অস্থায়ী শূন্য পদে নিয়োগ এবং পদায়নের নজির রয়েছে। অর্থাৎ পদটি সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বীকৃত জনবল কাঠামোর অংশ।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় বড় প্রশ্ন হচ্ছে—নতুন ডিএমএফধারীদের জন্য এই পদে নিয়মিত নিয়োগ কতটা হচ্ছে?

নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ম্যাটস শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় নিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। একই সময়ে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর কথাও জানানো হয়।

তবে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বড় পরিসরের, দেশব্যাপী সরকারি নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে—এমন হালনাগাদ সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকা সহজলভ্য সরকারি নথিতে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং ২০২৬ সালের আগস্টেও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো নতুন করে তৃণমূল পর্যায়ে SACMO পদ সৃষ্টির দাবি জানাচ্ছে। ২১ আগস্ট ২০২৬-এর এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ সৃষ্টিসহ প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, ২০২৫ সালে নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলা হলেও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান হয়েছে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত সরকারি প্রমাণ নেই।

সরকারি ব্যবস্থায় শূন্য পদ আছে, কিন্তু নিয়োগের পথ স্পষ্ট নয়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান HRM Facility Registry-তে বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ‘Medical Assistant’ পদ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এসব পদ শূন্যও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রিতে Medical Assistant-এর একটি পদ ১১তম গ্রেডে শূন্য দেখানো হয়েছে। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একই পদে দুটি শূন্য পদ ১৬তম গ্রেডে দেখানো হয়েছে।

আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রিতে উন্নয়ন খাতের একটি Medical Assistant পদও শূন্য রয়েছে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের HRM-এ পদ শূন্য থাকা মানেই সেই পদে ডিএমএফধারীদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে—এমন নয়। নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট পদ, নিয়োগবিধি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ছাড়পত্র এবং বিজ্ঞপ্তি—সবগুলো ধাপ প্রয়োজন।

২০২৬ সালেও সরকারি নিয়োগের দাবি কেন?

ডিএমএফ শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের মধ্যে মূল অভিযোগ হলো—শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখে পর্যাপ্ত সরকারি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে নতুন করে বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমাধারী কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় পড়ছেন।

২০২৫ সালের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক বেকার ডিএমএফধারীর কথা বলা হয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থায় SACMO পদে শূন্যতার দাবি করা হয়। এসব সংখ্যা মূলত আন্দোলনকারী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য; তাই এগুলোকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের আগস্টে আবারও নতুন পদ সৃষ্টির দাবি ওঠা থেকে বোঝা যায়, নিয়োগ ও জনবল কাঠামোর প্রশ্নটি এখনো ডিএমএফ পেশাজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়।

বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ আছে

সরকারি নিয়োগে অনিশ্চয়তা থাকলেও ডিএমএফধারীদের জন্য বেসরকারি ও এনজিও খাতে কাজের সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালেও বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থায় SACMO/Medical Assistant ধরনের পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে YPSA-এর সাম্প্রতিক একটি বিজ্ঞপ্তিতে SACMO পদে নিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়।

এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও এনজিওতে ‘Medical Assistant’ পদে ডিএমএফ বা সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা চাওয়া হয়। তবে এসব চাকরির বেতন, দায়িত্ব, নিয়োগের শর্ত ও চাকরির নিরাপত্তা সরকারি চাকরির মতো এক নয়।

উচ্চশিক্ষার দাবিও পুরোনো

ডিএমএফ শিক্ষার্থীদের অন্যতম দীর্ঘদিনের দাবি হলো উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। ২০২৫ সালের আন্দোলনেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কোর্স কারিকুলাম সংস্কার এবং পেশাগত কাঠামো নিয়ে দাবি ওঠে।

অন্যদিকে সরকারি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিভিন্ন নথিতে ডিএমএফধারীদের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা কাজে অংশগ্রহণের সুযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে বর্তমান বিতর্কের মূল জায়গা শুধু ‘কোর্সের স্বীকৃতি আছে কি না’ নয়; বরং কোর্স শেষ করার পর পেশাগত দায়িত্ব, পদ, নিয়োগ, উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির কাঠামো কতটা সুস্পষ্ট—সেটিই বড় প্রশ্ন।

সরকারের পদক্ষেপ কতটা এগিয়েছে?

ডিএমএফ-ম্যাটস ইস্যুতে সরকারের পদক্ষেপকে মোটামুটি চারটি পর্যায়ে দেখা যায়—

প্রথমত, শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ম্যাটসে ভর্তি এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে একাধিক ধাপে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানো হয়।

তৃতীয়ত, SACMO পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল। তবে এর চূড়ান্ত বাস্তবায়নের প্রমাণ আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চতুর্থত, স্বাস্থ্য জনবল কাঠামোতে Medical Assistant/SACMO পদ বিদ্যমান রাখা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের HRM রেজিস্ট্রিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে Medical Assistant পদ এবং শূন্যপদের তথ্য এখনো দেখা যাচ্ছে।

তাহলে বর্তমান অবস্থা কী?

সব তথ্য মিলিয়ে ২০২৬ সালের আগস্টে ডিএমএফের চিত্রকে বলা যায়—‘শিক্ষা চলছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের কাঠামো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।’

একদিকে সরকারিভাবে ম্যাটস শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এবং নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় Medical Assistant/SACMO ধরনের পদ রয়েছে এবং কিছু পদ শূন্যও রয়েছে। কিন্তু ডিএমএফধারীদের প্রত্যাশিত বড় পরিসরের নিয়মিত নিয়োগ, নতুন পদ সৃষ্টি, পদমর্যাদা ও উচ্চশিক্ষার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৫ সালের আন্দোলনের পর নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তার এক বছর পরও ২০২৬ সালের আগস্টে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সংগঠনকে নতুন করে SACMO পদ সৃষ্টির দাবি তুলতে হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত করে যে নিয়োগ সংকটের কাঠামোগত সমাধান এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

সামনে কী প্রয়োজন?

ডিএমএফ-ম্যাটস খাতের সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্টদের মতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—শূন্য সরকারি পদে দ্রুত নিয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি, নিয়োগবিধি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার স্পষ্টতা, SACMO পদের গ্রেড ও ক্যারিয়ার কাঠামো নির্ধারণ, কোর্স কারিকুলামের আধুনিকায়ন এবং উচ্চশিক্ষার বাস্তবসম্মত পথ তৈরি।

কারণ, শুধু প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করলেই একটি পেশাগত শিক্ষাক্রমের সাফল্য নিশ্চিত হয় না। শিক্ষা শেষে প্রশিক্ষিত জনবলকে কোথায়, কী দায়িত্বে এবং কী কাঠামোর অধীনে কাজে লাগানো হবে—তার একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের HRM Facility Registry এবং সাম্প্রতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন।